‘ভবিষ্যতে সাধারণ সর্দি-কাশি বা কাটা-ছেঁড়াজনিত সংক্রমণেই মারা যাব’



সাম্প্রতিক সময়ে অ্যান্টিবায়োটিকের অতি ব্যবহার রোধে রীট আবেদনে ইতিবাচক রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। এ বিষয়ে মতামত জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আ ব ম ফারুক

একজন আইনজীবীর প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি নিষিদ্ধ করার রীট আবেদনের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি মাননীয় হাইকোর্ট ইতিবাচক রায় দিয়েছেন। আমরা এই রায়কে স্বাগত ও মাননীয় হাইকোর্টকে অভিনন্দন জানাই। সেইসঙ্গে ধন্যবাদ জানাই রিট আবেদনকারীকে। দুয়েকজন বাদে অন্যদের মতো এই আইনজীবী শুধু অর্থ রোজগারের দিকেই মনোনিবেশ করেননি। তিনি জনস্বার্থে একটি জটিল জনসমস্যার সমাধান চেয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এখন ‘দি ডেইলি টেলিগ্রাফ’ জানাচ্ছে বাংলাদেশে আইসিইউ-এ প্রতি ১০ জন মৃত রোগীর মধ্যে ৮ জনই মারা যাচ্ছেন জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে। এ প্রেক্ষিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি নিষিদ্ধের রায়টি সচেতন জনগণের কাছ থেকে অবশ্যই অভিনন্দন পাবে। তবে এটি একটিমাত্র দিক। বলা যেতে পারে সমুদ্রে ভাসমান শৈলশিলার চূড়া মাত্র। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি ছাড়াও জীবাণুর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টির আরো যেসব কারণ রয়েছে এই নিবন্ধে তা সংক্ষিপ্তরূপে উল্লেখ করা হলো।

আমরা বাঁচতে চাইলে আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকগুলোকে বাঁচাতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার, যা রোগজীবাণুকে মেরে ফেলে। তাই জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হলে আমরা সেই সেই জটিল অসুখ সারাতে ওষুধ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি। কিন্তু এই অ্যান্টিবায়োটিক যেমন খুশি ব্যবহার করা যায় না। এর ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। নিয়ম ভেঙে ব্যবহার করলে তা শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে। এই ক্ষতির তালিকা দীর্ঘ। যেমন—অ্যালার্জিক বিক্রিয়া থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহ, যেমন কিডনি, লিভার ইত্যাদি বিকল হয়ে কালক্রমে মৃত্যুবরণ করা। এসব ক্ষতি দৃশ্যমান। কিন্তু নীরব অথচ মারাত্মক আরেকটি ক্ষতি হলো জীবাণুর ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হওয়া অর্থাত্ জীবাণুগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে যাওয়া। এর ফলে চিকিত্সক সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করলেও এবং রোগী সঠিক মানসম্পন্ন সেই অ্যান্টিবায়োটিকটি সঠিকভাবে সেবন করলেও রোগের কারণ যে জীবাণুটি সেটি মরবে না, বরং নিজস্ব নিয়মে বংশ বিস্তার করেই যাবে। এর ফলস্বরূপ সংক্রমণটি ক্রমাগত বাড়তে থাকবে, হাসপাতালে গেলেও কোনো কাজ হবে না। রোগের এক পর্যায়ে রক্তের মাধ্যমে জীবাণুটি শরীরের সর্বত্র সংক্রমণের বিস্তৃতি ঘটাবে, সেপটিসেমিয়া অর্থাত্ রক্তের মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাবে, একের পর এক অঙ্গ বিকল হতে থাকবে, কালক্রমে মাল্টিঅর্গান ফেলিউর হয়ে একসময় রোগী মারা যাবে। এই অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্স একটি জীবাণুর কারণে না হয়ে একাধিক জীবাণুর কারণেও হতে পারে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাই ঘটে থাকে। আবার এই জীবাণুগুলোর রেজিস্ট্যান্স একটি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে না হয়ে একাধিক বা বহুবিধ অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে, তখন একে বলা হয় ‘মাল্টি-ড্রাগ রেসিন্ট্যান্স’, যা আরো ভয়াবহ।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিবিধ কারণে হতে পারে। প্রধান কারণটি হলো জীবাণুকে মারার জন্য যে পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন তার চেয়ে কম পরিমাণে ও কম সময়ব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক সেবন। তাছাড়া মানবদেহে ঘনঘন বা অধিক পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স সম্পন্ন না করা, কয়েকদিন ব্যবহারের পর একটু ভালো বোধ করলে আর সেবন না করা, নকল ভেজাল বা নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা ইত্যাদিও অন্যতম কারণ। এসব কারণে যাতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি না হয় তার জন্য বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই চিকিত্সকরা রোগীদেরকে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তার সদস্য দেশসমূহের সরকারের মাধ্যমে এসব বিষয়ে রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নানাবিধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশেও এরকম কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু আমাদের একটি অন্যতম সমস্যা হলো অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদনের প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা না থাকা সত্ত্বেও ওষুধ প্রশাসন কর্তৃক শতাধিক ওষুধ কোম্পানিকে অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদনের লাইসেন্স দেওয়ার কারণে তারা যুগ যুগ ধরে যেসব নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদন করছে, তার ফলে আমাদের দেশে জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মারাত্মকহারে বেড়ে এখন এটি একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে।

কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরির ক্ষেত্রে সম্প্রতি যে আরো একটি নতুন ও ভয়াবহ কারণ যোগ হয়েছে, তাহলো খাবারের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অনুপ্রবেশ। বাংলাদেশে এই অনুপ্রবেশ ঘটছে দু’ভাবে। প্রথমত, আমাদের মাংস, দুধ ও মাছের খামারিরা তাদের অসুস্থ গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি, পশু ও মাছকে চিকিত্সা করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার করছে। দ্বিতীয়ত, ফিড ম্যানুফ্যাকচারার অর্থাত্ পশুখাদ্য ও মাছের খাদ্যের উত্পাদকরা গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ও মাছের রোগ প্রতিরোধের নামে তাদের ফিডে কোনো যুক্তি ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক মেশাচ্ছে। খামারগুলোতে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি অসুস্থ হতেই পারে। এসব অসুস্থতার অনেকগুলোই জীবাণুর আক্রমণের কারণে ঘটতে পারে। সেগুলোর চিকিত্সার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সেগুলো নিতে হবে প্রাণিচিকিত্সার জন্য সুনির্দিষ্ট করা অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর মধ্য থেকে, কোনো অবস্থাতেই মানবচিকিত্সায় ব্যবহূত অ্যান্টিবায়োটিক থেকে নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানি ও প্রাণিচিকিত্সক মানুষের চিকিত্সায় নির্দেশিত অ্যান্টিবায়োটিকের অনেকগুলোই অতি মুনাফার লোভে ও দ্রুত আরোগ্যের জন্য নিয়মবিরুদ্ধভাবে প্রাণিচিকিত্সায় ব্যবহার করছেন।

অ্যান্টিবায়োটিক কখনোই কোনো রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না, শুধুমাত্র রোগ হয়ে গেলে সেই জীবাণুকে মারতে পারে। অথচ আমাদের দেশে ক্যাটল ফিড, পোল্ট্রি ফিড ও ফিস ফিডের অনেক কোম্পানি তাদের উত্পাদিত ফিডগুলোতে অনাবশ্যকভাবে প্রাণিদেহ ও মানবদেহে ব্যবহার্য উভয় ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক মেশাচ্ছে। তারা বলে এর ফলে নাকি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, মাছের অসুখ হওয়ার হার কমে যায় এবং এগুলোর স্বাস্থ্য ভালো হয়, অথচ এসব দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং কোনো অসুখ ছাড়া সামান্য পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রাণী খাবারে মিশিয়ে দেওয়ার ফলে এসব প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু জন্মাচ্ছে। এগুলো খেয়ে কিংবা এসব প্রাণীর সংস্পর্শ, রক্ত ও বিষ্ঠার মাধ্যমে এসব রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু মাটি ও পানিকে দূষিত করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে—মানুষের শরীরেতো বটেই। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুগুলোর জিন কোডিং অ্যান্টিবায়োটিক-সংবেদনশীল জীবাণুগুলোর শরীরে প্রবেশ করে সেগুলোকেও রেজিস্ট্যান্ট করে দিচ্ছে। এভাবে কোম্পানিগুলো নিজেরা মোটা অঙ্কের মুনাফা করছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের দেহে বিপজ্জনক অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি করে জনস্বাস্থ্যের বিপুল ক্ষতি করছে।

খাবার পানির উত্সগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক মিশে যাচ্ছে যেসব কারণে তার মধ্যে রয়েছে—(এক) অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকারী মানুষের বর্জ্য পৌর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রাসায়নিক দিয়ে পরিশোধন না করে নদীতে বা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ফেলা; (দুই) রোগীদের অব্যবহূত কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক ড্রেনে বা আবর্জনার বিনে ফেলে দেওয়া এবং (তিন) যেসব ওষুধ কোম্পানির উপযুক্ত বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট—ইটিপি) নেই তাদেরকেও ওষুধ প্রশাসন কর্তৃক অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদনের অনুমতি দেওয়ার ফলে তাদের কারখানার বর্জ্যগুলো খালে-বিলে-নদীতে কিংবা পৌর করপোরেশনের ড্রেনে সরাসরি ফেলে দেওয়া। এভাবে পরিবেশে নিঃসৃত অ্যান্টিবায়োটিক মত্স্য চাষ, কৃষি ও সেচের মাধ্যমে আমাদের খাবারে কিয়ত্পরিমাণে হলেও প্রবেশ করছে, ভূ-উপরিস্থ খাবার পানির উেস মিশে যাচ্ছে, এমনকি ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলোকেও স্পর্শ করছে। অতি সামান্য পরিমাণে হলেও এসব অ্যান্টিবায়োটিক তাই খাবার পানির মাধ্যমেও আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে।

মানবচিকিত্সার জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকগুলো প্রাণিসম্পদে ব্যবহূত হওয়ার সমস্যাটিই আজ বিশ্বব্যাপী বড় সংকট সৃষ্টি করেছে এবং বিজ্ঞানীরা এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছেন। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের এই সংকট এখনই থামানো বা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পৃথিবীময় সমগ্র মানব-সভ্যতা অদূর ভবিষ্যতে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং কোনো জটিল সংক্রমণ নয় বরং অতি সাধারণ সংক্রমণেই মানুষ মারা যেতে থাকবে। আমাদের বেঁচে থাকার স্বার্থেই তাই আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকগুলোকে বাঁচানো প্রয়োজন।

অ্যান্টিবায়োটিকগুলো প্রকৃতিতে অতি ধীরে নষ্ট হয়। সালফোনেমাইড, ক্লোইনোলন, টেট্রাসাইক্লিন ও কিছু ম্যাক্রোলাইড এজন্য সুবিদিত। অন্য অনেকগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের অবস্থাও তথৈবচ। তবে এমাইনোগ্লাইকোসাইড এবং বিটা-ল্যাকটামগুলো সহজেই নষ্ট হয়। অর্থাত্ অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই প্রকৃতিতে সহজে বিনষ্ট হয় না বলে এগুলো থেকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স সৃষ্টির আশঙ্কা অনেক বেশি। তাই অ্যান্টিবায়োটিক অত্যন্ত হিসেব করেই ব্যবহার করা উচিত।

অথচ তা হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৫ সালে সারা পৃথিবীতে ৬৩,২০০ টন অ্যান্টিবায়োটিক প্রাণিদেহে ব্যবহূত হয়েছে। এই হারে চললে ২০৩০ সালে যা ১,০৫,৬০০ টনে গিয়ে দাঁড়াবে। আর এরফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে তা যে কত ভয়াবহ তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেক পরিসংখ্যানই বলে দেয়। সেখানে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স সমস্যায় আক্রান্ত হয় এবং এদের মধ্যে প্রায় ২৩ হাজার লোক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর সংক্রমণে মারা যায়।

আমাদের দেশে এতকালের প্রচলিত ওষুধের দোকানগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকসহ কোনো ওষুধ কিনতেই কোনো প্রেসক্রিপশন লাগে না। টাকা থাকলে যেটা খুশি এবং যত খুশি ওষুধ কেনা যায়। পৃথিবীর কোনো সভ্য ও উন্নত দেশে এটি সম্ভব নয়। কারণ ওষুধ মাত্রেই বিষ, অ্যান্টিবায়োটিক আরো বিষ। সঠিক নিয়মে ব্যবহার করলে তবেই সেটি ওষুধ। তাই নিয়ম হচ্ছে ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকসহ যে কোনো ওষুধ কিনতে হবে, শুধুমাত্র যেসব ওষুধ সাধারণ অসুখে ব্যবহার হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া কম সেগুলো বাদে, যাদেরকে বলা হয় ওভার-দি-কাউন্টার বা ওটিসি ড্রাগস। ২০১৬ সালে জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নের সময় এই বিষয়গুলো আমরা আমলে নিয়ে ৩৯টি ওষুধের একটি ওটিসি ড্রাগ লিস্ট, ভোক্তা পর্যায়ে ওষুধ সরবরাহের জন্য ‘মডেল ফার্মেসি’ এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীদের কাছে ওষুধ প্রদানের জন্য ‘হসপিটাল ফার্মেসি’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছি। সরকার ওষুধনীতিতে এসব ইতিবাচক প্রস্তাবগুলো গ্রহণ ও ঘোষণা করেছেন। ওটিসি ড্রাগ লিস্টের প্রচার কার্যকরভাবে না হলেও সরকার বেশ কিছু ‘মডেল ফার্মেসি’ চালু করেছেন, যা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। ‘মডেল ফার্মেসি’ ও ‘হসপিটাল ফার্মেসি’ চালু হলে বাংলাদশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সমস্যা অনেকটাই কমবে।

বাজারে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর কার্যকারিতা হারানোর পাশাপাশি কিছুটা আশার বাণী থাকতে পারতো যদি বিজ্ঞান নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করতো। কিন্তু তাও হচ্ছে না। ওষুধের গবেষণা ও নতুন ওষুধ আবিষ্কার নিয়তই চলছে। কিন্তু সেগুলো হচ্ছে বড়লোক দেশগুলোর অসুখ ও বিশ্ববাজারকে বিবেচনায় নিয়ে। এই বিবেচনায় অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার এখনো বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। অথচ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো মরে গেলে আমরাও ভবিষ্যতে একসময় অতি সাধারণ সর্দি-কাশি বা কাটা-ছেঁড়াজনিত সংক্রমণেই মারা যাব।

এই বৈশ্বিক সংকটে আসুন বাংলাদেশে আমরা সচেতন হই, এই নৈরাজ্যের পরিবর্তনে সোচ্চার হই এবং সবকিছু সরকারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখি। ‘রোগ প্রতিরোধের’ অবাস্তব প্রত্যাশায় প্রাণিদেহে ও মাছে ফিডের সাথে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করি, নিজেরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় পুরো কোর্স সম্পন্ন করি, যেসব ওষুধ কোম্পানি অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদনের সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স পেয়ে নকল-ভেজাল-নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদন করছে তাদের অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদনের লাইসেন্স বাতিল করি এবং যেসব ওষুধ কোম্পানির বর্জ্য পরিশোধনের জন্য কার্যকর ইটিপি নেই তাদের তা তৈরি করতে বাধ্য করি।