গল্পটা বিজয়ের (পর্ব-১)



সাকিব আহমেদ

ড্রয়িংরুম থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে। এত চিৎকার কিসের? পুরো বাড়ি যেন মাথায় তুলছে চিৎকার করে। কৌতূহল জাগলো। নিজের বিছানাতে উঠে বসলাম। বালিশের পাশে হাতড়ে খুঁজে নিলাম নিজের চশমা। চোখে চাপিয়ে লাঠিটা হাতে নিলাম। বয়স হয়েছে, এখন আর ঠিক মতো হাটতে পারি না। এই লাঠিই ভরসা। চপ্পলে পা গলিয়ে উঠে দাঁড়াতেই যেন কষ্ট হয়। কাঁপা কাঁপা পায়ে হাটতে হাটতে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোতে লাগলাম। দরজার কাছে পৌঁছে দেখি, এ এক এলাহী কান্ড!

আমার নাতি হৃদ ও নাতনী তানহা লাফাচ্ছে আর চিৎকার করছে। তাদের মা, মানে আমার বৌমা হৃদ ও তানহাকে থামানোর চেষ্টা করছে। কে শোনে কার কথা? ওদের থামার কোনো লক্ষণই নেই।

আমাকে দেখে দৌড়ে আসলো হৃদ। জড়িয়ে ধরল আমাকে। ‘দাদু, আমরা জিতে গেছি।’, চিৎকার করতে করতে বলল হৃদ।

জিতে গেছি? কিসে জিতলাম? কে জিতলো? ‘কোথায় জিতলাম দাদু?’ হৃদকে জিজ্ঞেস করলাম। ‘কে জিতলো?’

‘বিশ্বকাপে,’ হৃদ জবাব দিলো। ‘আজকে সেমিফাইনাল ছিল। বাংলাদেশ জিতে গেছে। এখন ফাইনাল খেলব। ইউএসএ’র সাথে।’

খুব অবাক হলাম কথাটা শুনে। বাংলাদেশ কি তাহলে বিশ্বকাপ ফুটবলে সুযোগ পেল? তাও আবার ফাইনাল খেলবে! আমাদের সময় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলবে সেটা চিন্তা করাই ছিল দুঃস্বপ্ন।

আমার ভুলটা ভাঙলো একটু পরেই। হৃদকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাংলাদেশ ফুটবল বিশ্বকাপে সুযোগ পেল কবে থেকে?’

‘আরেহ দাদু,’ জবাব দিলো তানহা। ‘ফুটবল না, ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলছে বাংলাদেশ।’

মুহূর্তে মনের মধ্যে যে উত্তেজনা কাজ করছিল, তা নিমিষেই নিভে গেল। শেষ যখন বাংলাদেশকে ক্রিকেট খেলতে দেখেছি, তাতে ফাইনাল খেলা নিতান্তই অমূলক নয়। এত বছর পর ফাইনাল খেলছে বাংলাদেশ, তাতেই বরং অবাক লাগছে।

‘তুমি খুশি হও নাই দাদু?’ জিজ্ঞেস করল হৃদ।

‘খুশি হবো না কেন?’ জবাব দিলাম। ‘আমার দেশ ফাইনাল খেলছে, আমি খুব খুশি।’

‘আমরা ফাইনাল খেলা দেখতে যাবো,’ বলল তানহা। ‘তুমিও যাবে আমাদের সাথে। মজা হবে।’

প্রথমে যাবো না চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু কেন যেন মনটা ডাকছে। বাংলাদেশের ফাইনাল যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তাদেরকে কথা দিলাম যাবো। আবার দেখব বাংলাদেশের খেলা। আবারও লাল-সবুজের জন্য উল্লাস করব, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করব।

বাংলাদেশ ফাইনাল খেলছে! কত বছর লাল সবুজের রঙে রাঙা হয় না! কত দিন বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা হয় না! এতগুলো বছর পর বাংলাদেশের খেলা দেখতে যাবো, তাও আবার ফাইনাল। কেমন যেন রোমাঞ্চিত হয়ে পড়ছি, ঠিক যৌবনকালের সে সময়ের মত।

বয়স হয়েছে বলে এখন আর বাসা থেকে বের হতে ইচ্ছা করে না। এই চার দেয়ালের মাঝেই শান্তি। অথচ একসময় বাসায় থাকতে ইচ্ছা করত না।

ক্রিকেট খেলা দেখি না অনেক অনেক বছর হলো। সেই যে, ক্রিকেট বিশ্বকাপকে প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ন করার জন্য আইসিসি বিশ্বকাপের দল কমিয়ে এনেছিল সেদিন থেকেই আগ্রহ কমেছে। এরপর কখন যে খেলা দেখা বাদ দিয়ে দিয়েছি, বলতে পারব না। এতগুলো বছর পার হয়ে গেছে। আজ আবার ক্রিকেটের রোমাঞ্চে রোমাঞ্চিত হতে চলেছে।

ফাইনাল বলে কথা! বাংলাদেশ ফাইনাল খেলছে, তাও আবার বিশ্বকাপের। এমন দিন ঘরে বসে মিস করার কোনো মানেই হয় না। সুযোগ যখন হয়েছে, তখন দেখতে চাই। কেমন খেলে বাংলাদেশ? পরিবারের সবাই মিলেই দেখতে চলেছি ফাইনাল। স্বপ্নের ফাইনাল! অন্তত আমার জন্য তো স্বপ্নেরই মতো।

হৃদ বলেছে, এখন নাকি মিরপুরে আর খেলা হয় না। বিশ্বের সব থেকে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম এখন বাংলাদেশে। পূর্বাচলে নতুন স্টেডিয়াম তৈরি হবে শুনেছিলাম। সেটা যে এত বড় করে তৈরি করা হবে ভাবতে পারিনি। সেই মাঠেই আজ ফাইনাল খেলবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের খেলা দেখার আগ্রহ তো আছেই, সেই সাথে বিশ্বের বড় স্টেডিয়াম দেখার কৌতুহল বাড়ছে।

হৃদের কাছে সে স্টেডিয়ামের বর্ণনা শুনতে শুনতে আরো রোমাঞ্চিত হয়ে পড়ছি। হৃদের কাছে জানতে পারলাম, এখন নাকি টেস্ট খেলা হয় না। ৫০ ওভারের খেলাও নাকি কালে ভদ্রে হয়। বছরে একটি টুর্নামেন্ট দিয়েই দায় মুক্ত হতে চায় সবাই। তবে টি-টোয়েন্টি প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

তানহা বলেছে, এবার নাকি ৩২টি দল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছে। শুনে আমার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। আমাদের সময় তো ১০ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে কত যুদ্ধ! দল বাড়াতে হবে। কিন্তু আইসিসি কোনোভাবেই দল বাড়ানোর চেষ্টা করেনি। আমলে নেয়নি বড় বড় রথী মহারথীদের কথা।

তানহা ও হৃদের কাছে এখনকার ক্রিকেটের গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে কোনো রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছে। বিশ্বাস হয় না কিছুই।

এখন নাকি সব দলকেই বিশ্বকাপ খেলতে বাছাইপর্ব খেলতে হয়। এবারের বিশ্বকাপে সেই বাঁধা পেরোতে পারেনি পাকিস্তান।

ভাবা যায়! এশিয়া অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের ধারে কাছে কোনো দল নেই। এশিয়া থেকে সর্বোচ্চ দশটি দল বিশ্বকাপ খেলে। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকে যুক্ত করা হয়েছে এশিয়া অঞ্চলে। মোট বারোটি দল সুযোগ পায় এশিয়া অঞ্চল থেকে। ইউরোপ থেকে আটটি দল খেলে বিশ্বকাপে। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা থেকে চারটি করে দল সুযোগ পায়।

এত সব হৃদের কাছ থেকে জানতে পারলাম। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। ঠিক যেন ফুটবল বিশ্বকাপ! চীন-জাপান নাকি অনেক এগিয়ে গেছে ক্রিকেটে। তবে সবথেকে বেশি এগিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সাথে নেপালও খুব ভালো খেলে। তবে অনেকটাই পিছিয়েছে ভারত। এখন আর আগের সেই জৌলুস নাকি নেই। কোনোমতে বিশ্বকাপে সুযোগ পেলেও উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারে না এখন।

তানহা, হৃদের কাছে ক্রিকেটের গল্প শুনতে শুনতে কখন যে স্টেডিয়ামে পৌঁছে গেছি, টেরই পাই নি। ট্যাক্সি থেকে বের হয়ে হাঁটা ধরলাম। স্টেডিয়ামের গেটে উপচে পড়া ভিড়। এত ভিড় দেখতে ভালোই লাগছে। বাংলাদেশ ফাইনাল খেলছে, ভিড় তো হবেই। লাল-সবুজের এই দলটির জন্য কত আবেগ, কত ভালবাসা! উপলব্ধি করলাম, এতগুলো বছরেও এই ভালোবাসগুলো বিন্দুমাত্র কমেনি।

ভিড় ঠেলে অবশেষে প্রবেশ করলাম মাঠে। গ্যালারি জুড়ে লাল সবুজের বিশালতা। কি অদ্ভুত সুন্দর! তার চেয়েই বেশি সুন্দর মাঠটি। এত সুন্দর, বিশাল মাঠ বাংলাদেশে আছে ভাবাই যায় না। অন্তত আমাদের সময় ভাবতে পারতাম না। অবশ্য আজকের বাংলাদেশকেই তো কেউ আগে ভাবেনি।

পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে বাংলাদেশ বাংলাদেশ রব। লাল সবুজের জার্সি চারিদিকে। মাঠের সাথে গ্যালারীও যেন একাত্মতা প্রকাশ করেছে। সবুজের মাঝে লালের মিশেল যেন অদ্ভুত সৌন্দর্যের প্রতীক। এক পাশে বিশাল পতাকা উড়ছে, যেন বিজয়ের গান গাইছে।

হঠাৎ মনে হলো, আমার জার্সিটা পড়ে আসা উচিত ছিল! হোক পুরোনো জার্সি, তাও তো বাংলাদেশের। নিজের পুরোনো জার্সিগুলো আলমারিতে সযত্নে রেখে দিয়েছি বছরের পর বছর। কেউ জানে না, কেবলই আমি জানি। এখন তো আর গায়ে চাপানো হয় না। তানহা, হৃদ অবশ্য নতুন জার্সি পড়েই খেলা দেখতে এসেছে।

খেলা শুরু হওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। টসে জিতে বাংলাদেশ প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র করবে ব্যাটিং।

 

আরো পড়ুন:

স্বপ্নে বাংলাদেশ, স্বপ্নের বাংলাদেশ

এবং মাশরাফি…

বিশ্বকাপের বিশেষ গল্প ব্রাজেন্টিনা

বাঙালীয়ানা