করোনায় পাল্টে যাচ্ছে ব্যবসার ধরণ


Business#paperslife


মহামারী করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর এই দুর্যোগে বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র সবখানেই লাগছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এছাড়া বিভিন্ন উদ্যোক্তাদেরও ব্যবসার ধরন পাল্টে যাচ্ছে।

গৃহস্থালি, করপোরেট বা নিত্যনৈমিত্তিক কাজের সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান সেবা ডট এক্সওয়াইজেড করোনার প্রভাবে বিরাট পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অফিস ছিল রাজধানীর গুলশানের বেসরকারি টেকনোলজি পার্ক (কো-ওয়ার্কিং স্পেস) ডেভোটেকে। সেখান থেকে অফিস আয়তন ছোট করে এবং সব কর্মী একসঙ্গে কাজ করার জন্য বনানীতে অফিস নেয় সেবা ডট এক্সওয়াইজেড। করোনা শুরু হলে প্রতিষ্ঠানটি ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ঘোষণা করে সব কর্মীকে বাসা থেকে অফিস করার সুযোগ দেয়। বর্তমানে মিরপুর ডিওএইচএসে ছোট্ট একটা অফিস (সাব অফিস) থেকে পরিচালিত হচ্ছে সেবা। কর্মীরা ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাসা থেকে অফিস করবেন। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেবা ডট এক্সওয়াইজেড আবারও কোনও ভবন ভাড়া নিয়ে অফিস চালু করবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচলন কর্মকর্তা (সিইও) ইলমুল হক সজীব।

সেবার সহ-প্রতিষ্ঠাতা বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এই শিল্পে আমরাই প্রথম হোম অফিস ঘোষণা করি। মার্চ মাসেই এই সেবা খাতে (আমরা যেসব সেবা দিই) প্রভাব পড়ে। এপ্রিল মাসে খুবই খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যায় আমাদের প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে মে থেকে জুলাই মাসে আমরা ব্যবসায়িকভাবে ‘গেইন’ করে আগস্টে আবার আগের অবস্থায় ফিরেছি। তবে এখনই অফিস নিচ্ছি না। ডিসেম্বরের পরে গিয়ে আমরা ভেবে দেখবো আবার কিভাবে (অফিস নিয়ে) শুরু করা যায়। তিনি জানান, শুধু তাদের প্রতিষ্ঠানই নয়, অনেক প্রতিষ্ঠান বাজার অফিস গুটিয়ে নিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

করোনাভাইরাস ছাপ ফেলতে শুরু করেছে উদ্যোক্তা দুনিয়ায়। এর প্রভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে, কেউ ছোট করে ফেলছে সেবাদান কার্যক্রম, অফিস ছেড়ে চালু করেছে হোম অফিস। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা করোনাভাইরাসের সঙ্গে ব্যবসাকে খাপ খাইয়ে নিতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি পাশাপাশি বেতন কমিয়ে, কর্মীদের পার্ট টাইমে নিয়ে, রিসোর্স শেয়ার করতে শুরু করেছে। আর এসবের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করছে গিগ ইকোনমির (গিগ অর্থনীতি) যুগে। প্রসঙ্গত, গিগ অর্থনীতি হলো একটি খণ্ডকালীন কাজের ব্যবস্থা যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে কর্মী নিয়োগ না করে অল্প সময়ের জন্য বিশেষ শর্তে বিশেষজ্ঞ কর্মী নিয়োগ করে থাকে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মধ্যে করোনা বেশি প্রভাব ফেলেছে সফটওয়্যার, কল-সেন্টার, কনটেন্ট নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে। আউটসোর্সিংয়েও বেশ প্রভাব ফেলেছে। অনেক স্টার্টআপ বন্ধের পথে। কাজ বন্ধ ও আয় না থাকায় এগুলোর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান অফিস ছেড়ে টিকে থাকতে কো-ওয়ার্কিং স্পেসে জায়গা নিচ্ছে। অনেকে টিকে থাকতে বিজনেস মডেলে পরিবর্তন এনেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক ধরনের নতুন ইকোসিস্টেম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ করোনাকালে করোনাভাইরাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যকেন্দ্রিক ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছে। অনেকে ই-কমার্সে ভালো করছে। চাহিদা বেড়েছে দেখে অনেকে যাচ্ছে ই-কমার্সে। ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজনির্ভর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান চালু হচ্ছে। এর পাশাপাশি পুরনো ই-কমার্স সাইটগুলো নতুন করে ফিরে আসছে। ই-কমার্স মার্কেটপ্লেসেও যাচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য নির্মাতাদের সংগঠন বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, করোনার প্রভাবে এখন পর্যন্ত কোনও সদস্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এমন খবর আমাদের কাছে নেই। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, যারা বন্ধের চিন্তা করছিলে আমরা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে সেসব প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়েছি। অফিস ছোট করে, কর্মী ছাঁটাই না করে, বেতন কমিয়ে হলেও রাখতে বলেছি। তা না হলে এসব দক্ষ হাত অন্য পেশায় চলে যাবে। বিশাল ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকায় আমরা সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বসে তাদের টিকে থাকার উপায় বের করেছি।
বেসিস সভাপতি জানান, অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের পার্ট টাইম করে ফেলছে। এতে করে রিসোর্স শেয়ার করা যাবে। একজন দক্ষ কর্মী একই সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আরও বেশি আয় করতে পারবে। এটাকে বলা হয় গিগ অর্থনীতি। সারাবিশ্বে এ অর্থনীতির ঢেউ লেগেছে। আমাদের দেশেও সেই ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমার মনে হয়, করোনার পরে এই গিগ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

দেশে কল-সেন্টার ও আউটসোর্সিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘বাক্য’র মহাসচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, আমাদের কোনও কাজ নেই। কোনও প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়নি। কারণ এ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল অবকাঠামো থাকতে হয়। তা না হলে সেবা দেওয়া যায় না। একবার বন্ধ করলে বা গুটিয়ে ফেললে চালু করা বেশ কঠিন ব্যাপার। তাই প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও টিকে আছে। তবে ডিসেম্বর নাগাদ এই খাতে একটা পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি মনে করেন, অক্টোবর মাসের মধ্যে যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসে তাহলে ভালো। তা না হলে ডিসেম্বর মাসে এই খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। আর এই অবস্থা চললে ডিসেম্বরের পরে অনেক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা কঠিন হবে। যারা টিকে থাকবে তারা তাদের ব্যবসায়িক মডেল ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে নিয়ে যাবে।

সফটওয়্যার, সেবা ও কনটেন্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এরিনাফোন বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে রাব্বি বলেন, আমরা অফিস ছোট করে ফেলবো। করোনার এই সময়ে (নিও নরমাল) যারা হোম অফিস করছেন তাদেরকে সপ্তাহে এক বা দুদিন অফিস করতে হবে, বাকি দিন তারা বাসা থেকেই কাজ করবেন। আমরা এমন বিজনেস প্ল্যান করছি যাতে কর্মীদের জন্য অল্প জায়গা লাগে। তিনি মনে করেন, করোনা পরবর্তী সময়ে বা এখনই নতুন নতুন বিজনেস মডেল আসবে যা হয়তো আরও কয়েক বছর পরে আসতো। তিনি জানান, ২-৩টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের কথা তিনি শুনেছেন। কর্মীদের বেতন কমানোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান। তবে ভবিষ্যতে কী হবে তা এখনই পরিষ্কার করে বলা যাবে না।

দেশের প্রথম বেসরকারি টেকনোলজি পার্ক হলো রাজধানীর গুলশানের ডেভোটেক। এই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে প্রায় ৫০০টির মতো সিট। রয়েছে ফুল অফিস সলিউশন। এই পার্কে রয়েছে একাধিক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ অফিসও।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) হাবিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমাদের এখানে যারা সিট নিয়েছিলেন তাদের ৬০ শতাংশ হোম অফিস বা রিমোট অফিস করছেন। তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন একাধিক রিকয়ারমেন্ট এলেও বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে। হয়তো শিগগিরই এ অবস্থা কেটে যাবে।

একটি সাজানো গোছানো বিশাল অফিসে নিজের অফিস গড়ে তোলাকে বলা হচ্ছে কো-ওয়ার্কিং স্পেস। ঢাকায় একাধিক কো-ওয়ার্কিং স্পেস গড়ে উঠেছে। জানা যায়, এরকম কো-ওয়ার্কিং স্পেসের সংখ্যা ১৩টি। এমনই একটি কো-ওয়ার্কিং স্পেসের নাম কো-স্পেস। প্রতিষ্ঠানটির ৬০ ভাগ এরই মধ্যে বুকিং শেষ বলে জানালেন এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাহাদ ইবনে ওয়াহাব। তিনি বলেন, জুলাই মাসে আমরা অনেক আবেদন পেয়েছি, অনেক অফিস আমাদের এখানে অফিস (সিট) নিতে চায়। তিনি জানান, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই সাড়া বেশি আসছে। অনেকেই তাদের অফিস ছেড়ে দিয়ে এখানে ‘সিট’ নিয়ে অফিস চালু রাখতে চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, জুলাই মাসে একটি অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি ও একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি আমাদের এখানে অফিস নিয়েছে। এদের একটির অফিস ছিল মিরপুর ডিওএইচএস-এ, অন্যটির ছিল গুলশানে। তিনি জানান, ৫টি প্রতিষ্ঠান পাইপ লাইনে রয়েছে। সফটওয়্যার কোম্পানিও রয়েছে তালিকায়। এ মাসের যে কোনও সময়ে তারা এখানে অফিস শুরু করবে।