ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের, কমলো তেলের দাম


ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের, কমলো তেলের দাম

ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে সম্ভাব্য সামরিক হামলা স্থগিত রাখার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক ঘোষণায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ১৩ শতাংশের বেশি কমেছে। গত কয়েক সপ্তাহের চরম অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বাজার এখন অনেকটাই নিম্নমুখী।


মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ কাটতেই দরপতন

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যে উত্তাপ ছড়িয়েছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল জ্বালানি তেলের বাজারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের ডামাডোলে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি প্রায় বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল।

তবে সোমবার মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যখন জানানো হলো যে, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে আপাতত কোনো বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, অমনি তেলের বাজারে বড় ধরনের সংশোধন লক্ষ্য করা যায়। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আশঙ্কা ছিল, ইরানি জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহে বিশাল ঘাটতি তৈরি হবে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সেই শঙ্কার মেঘ আপাতত কেটেছে।

ডব্লিউটিআই ও ব্রেন্ট ক্রুড: কোথায় দাঁড়িয়েছে দাম?

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৭ ডলার বা ১৫ শতাংশ কমে ৯৬ ডলারে নেমে এসেছে। কয়েক দিন আগেও যা সাধারণ আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের মতো।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার তথা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও পাল্লা দিয়ে কমেছে। সেখানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৩ ডলার বা ১৩.৫ শতাংশ কমে ৮৫.২৮ ডলারে থিতু হয়েছে। তেলের এই রেকর্ড পতন বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

জ্বালানি বাজারের মূল উপাত্তসমূহ

বিশ্ববাজারের বর্তমান অস্থিরতা ও সর্বশেষ পরিবর্তনের চিত্রটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ব্রেন্ট ক্রুড: বর্তমান মূল্য ৯৬ ডলার (কমেছে ১৫%)।

  • ডব্লিউটিআই: বর্তমান মূল্য ৮৫.২৮ ডলার (কমেছে ১৩.৫%)।

  • হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব: বিশ্বের মোট জ্বালানি ও এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।

  • পূর্ববর্তী রেকর্ড: যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম আগের তুলনায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল।

  • প্রধান প্রভাবক: ইরানের কৌশলগত অবকাঠামোতে হামলা না করার বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণা।

হরমুজ প্রণালি ও আগামীর অনিশ্চয়তা

তেলের দাম কমলেও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। ইরান এই প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণে রাখায় এবং সেখানে নৌ-চলাচল সীমিত থাকায় সরবরাহ চেইন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয় অবস্থান তেহরানের ওপর থেকে চাপ কিছুটা লাঘব করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রপথটি সচল করার পথ প্রশস্ত করবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই কৌশলগত পিছুটান কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের আগে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার হাত থেকে বাঁচাতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।