দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্বস্তির খবর নিয়ে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বন্দরে ভিড়ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বোঝাই তিনটি বিশাল ট্যাংকার। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এই জাহাজগুলোতে থাকছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার টন এলএনজি, যা জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাগরে অপেক্ষমাণ ‘এইচএল পাফিন’, আসছে আরও দুই জায়ান্ট
চট্টগ্রাম বন্দর ও পেট্রোবাংলা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এলএনজি আমদানির এই বিশেষ সূচির প্রথম ধাপে গত বৃহস্পতিবারই কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছেছে ‘এইচএল পাফিন’। অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬১ হাজার ৯৯৭ টন এলএনজি নিয়ে আসা এই ট্যাংকারটি এখন খালাসের অপেক্ষায় বাংলাদেশের জলসীমায় অবস্থান করছে।
বন্দর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহ চেইন সচল রাখতে আগামী বুধবারের মধ্যে আরও দুটি বড় জাহাজ বন্দরে ভিড়বে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬১ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আসছে ‘নিউ ব্রেভ’। অন্যদিকে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৭০ হাজার টন জ্বালানি নিয়ে আসছে ‘সেলসিয়াস গ্যালাপাগোস’। এক সপ্তাহের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ গ্যাস আমদানির ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা
গত কয়েক মাস ধরে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ও সার কারখানাগুলো এই সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছিল। তেলের উচ্চমূল্য ও ডলার সংকটের মাঝে এই এলএনজি আমদানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একযোগে তিনটি ট্যাংকার আসার ফলে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালগুলোর (FSRU) সক্ষমতা পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এটি কেবল শিল্প নয়, সামনের গরমে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতেও বড় সহায়ক হবে।
একনজরে এলএনজি আমদানির চিত্র:
মোট আমদানিকৃত এলএনজি: প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার টন।
এইচএল পাফিন (অস্ট্রেলিয়া): ৬১,৯৯৭ টন (ইতিমধ্যে কুতুবদিয়া পৌঁছেছে)।
নিউ ব্রেভ (ইন্দোনেশিয়া): ৬১,০০০ টন (বুধবারের মধ্যে পৌঁছাবে)।
সেলসিয়াস গ্যালাপাগোস (যুক্তরাষ্ট্র): প্রায় ৭০,০০০ টন (বুধবারের মধ্যে পৌঁছাবে)।
মূল প্রভাব: জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদন সচল রাখা।
সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা
এত বিশাল পরিমাণ এলএনজি খালাস করা এবং তা দ্রুত পাইপলাইনে সরবরাহ করা বন্দর ও গ্যাস কর্তৃপক্ষের জন্য একটি কারিগরি চ্যালেঞ্জ। বঙ্গোপসাগরের বর্তমান আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং টার্মিনালগুলোতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা না দিলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প মালিকরা এর সুফল পেতে শুরু করবেন। তবে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনের ওপরও জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
চট্টগ্রাম বন্দরে এই তিন ট্যাঙ্কারের আগমন বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি সময়োপযোগী ঘটনা। এটি প্রমাণ করে যে সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় রেখে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।

