ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে ফিলিস্তিনিদের ওপর নতুন করে ব্যাপক মাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। শুক্রবারের একটি প্রাণঘাতী হামলার জের ধরে শহরের আল-জালদা ও আশপাশের এলাকার প্রায় ২,২০০ জনকে জোরপূর্বক নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হঠাৎ করে পাওয়া এমন কঠোর নির্দেশে চরম আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন ওই এলাকার শত শত পরিবার। স্থানীয় বাসিন্দারা গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন, গাজা উপত্যকার মতো পশ্চিম তীরেও হয়তো ঘরবাড়ি ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইসরায়েলি সেনারা এরই মধ্যে হেবরনের চারপাশের সমস্ত প্রবেশপথ ও চেকপয়েন্ট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে পুরো এলাকায় ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবারের একটি প্রাণঘাতী ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে। হেবরনের ফারশ আল-হাওয়া চেকপয়েন্টের কাছে ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। এই ঘটনার পরপরই ইসরায়েলি প্রশাসন পুরো পশ্চিম তীর জুড়ে কঠোর নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ এবং অবরোধের ঘোষণা দেয়। হেবরনের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন যে, শহরের আল-জালদা এবং আইন দেইর বাহা এলাকার প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর নির্দেশের পরপরই ওই এলাকায় ইসরায়েলি বুলডোজার প্রবেশ করে এবং একটি তিনতলা আবাসিক ভবনসহ বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও কারখানা গুঁড়িয়ে দেয়। উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের মাত্র কয়েক মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। হামলাকারীদের সন্ধানের নামে বাড়ি বাড়ি তল্লাশির পাশাপাশি সন্দেহভাজনদের আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
হঠাৎ করে চাপিয়ে দেওয়া এই উচ্ছেদ অভিযান ও সামরিক অবরোধের কারণে পশ্চিম তীরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ থমকে গেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পুরো পশ্চিম তীরে প্রায় ৯৪২টি ইসরায়েলি চেকপয়েন্ট বা সামরিক প্রতিবন্ধক রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২২১টি কেবল হেবরন প্রদেশেই অবস্থিত। বর্তমান উত্তেজনার জেরে এসব চেকপয়েন্টের বেশিরভাগই বন্ধ করে দেওয়ায় লাখ লাখ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল অচল হয়ে পড়েছে। জরুরি চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলো অবরুদ্ধ থাকায় চরম মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, চেকপয়েন্টগুলো এভাবে বন্ধ করে মানুষের চলাচল পুরোপুরি সীমিত করা আসলে এক ধরনের সম্মিলিত শাস্তি। ইসরায়েলি বাহিনীর এমন পদক্ষেপে পুরো পশ্চিম তীর যেন একটি উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে।
গাজায় চলমান আগ্রাসনের পাশপাশি পশ্চিম তীরেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি সেনা ও কট্টরপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে জলপাই সংগ্রহের এই মৌসুমে কৃষকদের ওপর নিয়মিত হামলার ঘটনা ঘটছে। নিজেদের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া হেবরনের পরিবারগুলো এখন শীতের মুখে সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় ভয় হলো, গাজায় যেভাবে টানা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পুরো শহরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, হেবরনে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যেও একই পরিণতি লেখা হচ্ছে কি না। সাধারণ নাগরিকদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তা আমলায় নিচ্ছে না।
বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে ফিলিস্তিনিদের এই অবিরাম বাস্তুচ্যুতির খবর তীব্র ক্ষোভ ও বেদনার জন্ম দেয়। যুগের পর যুগ ধরে নিজেদের ভূখণ্ডে পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি নিছক বাসস্থান হারানো নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক অন্তহীন সংগ্রাম।

