আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জুতা রপ্তানির চিত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে চীনের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি, ভারতের বাজারে সম্প্রসারণ এবং মেক্সিকোতে নতুন রপ্তানি শুরুর ফলে সামগ্রিক রপ্তানিতে গতি ফিরেছে। এতে বাংলাদেশের জুতাশিল্পের সামনে একদিকে যেমন প্রতিযোগিতার চাপ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ ৪২ কোটি মার্কিন ডলারের জুতা রপ্তানি করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩১ কোটি ডলার। সে হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। একই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে জুতাশিল্প বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে সব বাজারে সমান সাফল্য নেই। ইউরোপে ক্রয়াদেশ কমলেও অন্য বাজারের চাহিদা বৃদ্ধিই সামগ্রিক রপ্তানিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের প্রভাব চীনের রপ্তানি কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। দেশটির বাজারে শুল্কজনিত চাপের মুখে চীনা রপ্তানিকারকেরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পণ্য বিক্রির দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছেন। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে কম দামে জুতা সরবরাহ করায় প্রতিযোগিতায় চাপে পড়েছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ চামড়াবিহীন জুতা তৈরির কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও একই দেশের উৎপাদকদের সঙ্গে চূড়ান্ত পণ্যের দামে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারে ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের বাজারে চ্যালেঞ্জের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জুতা রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। চীনা পণ্যের ওপর শুল্কের চাপের কারণে মার্কিন ক্রেতাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ক্রয়াদেশ পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ভারতের বাজারেও রপ্তানি বাড়ছে।
এর পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে মেক্সিকোতে জুতা রপ্তানি শুরু করেছে একটি দেশীয় কারখানা। ফাইভ-আর ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাসির খান জানান, চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় উদ্যোক্তারা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নতুন বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিকারক এনপলি ফুটওয়্যার গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় তিন হাজার কর্মী প্রতিদিন ১৪ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন করছেন। ক্রয়াদেশ বৃদ্ধির কারণে আগামী মাস থেকে আরও একটি শিফট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নতুন করে দেড় হাজার কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ জানিয়েছেন, তিনটি মার্কিন ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান তাদের কারখানায় পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ দেখিয়েছে। ক্রেতাদের শর্ত পূরণে কারখানার উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে দুই বা তিন শিফটে উৎপাদন চালানোর লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
বাংলাদেশের জুতা রপ্তানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পণ্যের ধরন। দেশে এখনো চামড়ার জুতার রপ্তানি বেশি হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াবিহীন জুতার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বড়।
গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ১২২ কোটি ডলারের জুতা রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৫৭ শতাংশ ছিল চামড়ার জুতা এবং ৪৩ শতাংশ চামড়াবিহীন জুতা। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে রপ্তানি হওয়া জুতার মোট মূল্যের ৬৩ শতাংশ চামড়াবিহীন এবং ৩৭ শতাংশ চামড়ার জুতা।
দেশীয় রপ্তানিতেও চামড়াবিহীন জুতার অংশ বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হওয়া জুতার ৪০ শতাংশ ছিল চামড়াবিহীন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৪ শতাংশ হয়। তবে সামগ্রিক রপ্তানিতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এখনো নিশ্চিত হয়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩০ কোটি ডলারের জুতা রপ্তানির পর পরের অর্থবছরে তা কমে ১১৯ কোটি ডলারে নেমে আসে। বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় আড়াই শতাংশ।
নাসির খানের ধারণা, বৈশ্বিক চাহিদা বাড়তে থাকায় আগামী বছরগুলোতে চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। তবে সে জন্য বন্ড সুবিধাসহ রপ্তানিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জটিলতা দূর করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জুতাশিল্পের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ কেবল বেশি পণ্য রপ্তানি করা নয়; বরং কোন বাজারে কী ধরনের জুতার চাহিদা রয়েছে, সেই অনুযায়ী উৎপাদন ও বিপণন কৌশল সাজানো। ইউরোপের বাজারে চীনের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতা মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ নতুন বাজারে অবস্থান শক্ত করতে পারলে বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

