বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিচুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন সমঝোতা চূড়ান্ত করে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এখন ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ।
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে ভারত জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রত্যাশা কেবল পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নতুন ব্যবস্থা, পানির ন্যায্য হিস্যা এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত করা। ফলে ডিসেম্বরের সময়সীমাকে সামনে রেখে আলোচনার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে গঙ্গার পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগির ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশে নদীটির নিম্নপ্রবাহ পদ্মা নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসের পানি বণ্টন হয়। ফারাক্কায় পানির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ভাগ নির্ধারণের পাশাপাশি ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত তিনটি পর্যায়ে পালাক্রমে উভয় দেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশের পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এনি ৮ অক্টোবর জানান, সরকার নতুন বা সংশোধিত চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের ব্যবস্থার মতো নিশ্চয়তামূলক ধারা ফিরিয়ে আনার পক্ষে। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির চাহিদা সুরক্ষিত করা জরুরি। দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের কারিগরি পর্যায়ে এ নিয়ে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নয়; নদীর পানিপ্রবাহের মৌসুমি বৈপরীত্যও বড় সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পেলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ ও নদীনির্ভর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার চাপও পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তোলে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকার পানিসংকট, কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি এবং পদ্মায় মাছ ধরার সুযোগ কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতাধীন জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষক, জেলে এবং নদীর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর আয় ও খাদ্যনিরাপত্তায় চাপ বাড়তে পারে।
বর্ষায় আবার অতিরিক্ত পানিপ্রবাহ, বন্যা ও নদীভাঙন বড় ঝুঁকি তৈরি করে। পানি সম্পদমন্ত্রীও দুই দেশের আলোচনায় শুষ্ক মৌসুমে পানির নিশ্চয়তার পাশাপাশি বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহের ক্ষতি মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই নতুন চুক্তিতে শুধু পানির পরিমাণ নয়, মৌসুমি প্রবাহের ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য বিনিময়ও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর বলেন, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসংক্রান্ত বিষয় যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোতে আলোচনা করা হবে এবং গঙ্গার চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও নতুন চুক্তি নিয়ে কাজ চলার কথা জানানো হয়েছে।
তবে দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত। ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের সংসদে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে বলা হয়েছিল, তখন চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু হয়নি। পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে কারিগরি পর্যায়ের যোগাযোগের কথা এসেছে। অর্থাৎ আলোচনার অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের নিশ্চয়তা এখনো প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত নয়।
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বাড়ানোর বিধান নেই; নবায়নের জন্য উভয় পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতা না হলে ভবিষ্যৎ পানি বণ্টনের কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই বৈজ্ঞানিক তথ্য, দীর্ঘমেয়াদি নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কার্যকর নিশ্চয়তামূলক ধারা আলোচনায় তুলে ধরা জরুরি।
নতুন চুক্তি শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, নদীর পরিবেশ, সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ এবং লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত। ডিসেম্বরের সময়সীমার আগে বাস্তবসম্মত ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তাই বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

