চীনে অভিনব এআই প্রতারণা শুরু হয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অভাবী শিশুদের কাল্পনিক ভিডিও তৈরি করে বয়স্কদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাস্তবের অস্তিত্বহীন এসব আবেগঘন চরিত্রের প্রতি প্রবীণ নেটিজেনদের সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র মূলত নিজেদের পণ্য বিক্রি করছে এবং বিপুল মুনাফা লুটে নিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওর দৃশ্যপট অত্যন্ত নিখুঁত ও মর্মান্তিক। কোনোটিতে দেখা যায় স্কুলের পোশাক পরা এক কিশোর অঝোরে কাঁদছে, আবার কোনোটিতে বৃষ্টিতে ভেজা এক শিশু করুণ কণ্ঠে জানাচ্ছে তার ঘরে কোনো খাবার নেই। অভাব আর দারিদ্র্যের এমন জীবন্ত উপস্থাপনা দেখে খুব সহজেই গলে যাচ্ছেন বয়স্ক দর্শকরা। তারা ওই তথাকথিত অসহায় শিশুদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ভিডিওর সাথে যুক্ত থাকা লিংক থেকে অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য কিনে নিচ্ছেন। প্রযুক্তিগত জ্ঞান কম থাকায় তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারছেন না, পর্দার ওপারে থাকা ছেলেটি কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিপফেক (Deepfake) প্রযুক্তির সাহায্যে এখন অত্যন্ত নিখুঁত মানব অবয়ব তৈরি করা সম্ভব। প্রতারকরা এমন অ্যালগরিদম ব্যবহার করছে যা খুব সহজেই মানুষের মানবিক দুর্বলতাকে ছুঁয়ে যায়। ভিডিওর স্ক্রিপ্ট, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং চরিত্রের অভিব্যক্তি এমনভাবে সাজানো হয় যেন তা সরাসরি দর্শকের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে।
ভিডিওগুলোর নিচে থাকা লিংকে সাধারণত স্বাস্থ্য সুরক্ষার নানা উপাদান, সস্তা কৃষিপণ্য কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণ সামগ্রী বিক্রি করা হয়। শিশুদের করুণ পরিণতির গল্প শুনে বয়স্করা মনে করেন, এসব পণ্য কিনলে পরোক্ষভাবে ওই শিশুটিরই সাহায্য হবে। অথচ পুরো প্রক্রিয়ায় অর্জিত অর্থের শতভাগ চলে যায় অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেটে। চীনে শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই ধরনের কন্টেন্ট দ্রুত ভাইরাল হওয়ার সুযোগ থাকায় খুব কম সময়েই লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এসব নকল ভিডিও।
প্রবীণ নাগরিকদের ডিজিটাল দুনিয়ার জটিলতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা তুলনামূলকভাবে কম। তারা দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও, স্ক্রিনে দেখা যেকোনো কনটেন্টকেই সত্য বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে বেশি কাজ করে। তাদের নিঃসঙ্গতা এবং অপরের প্রতি সহজাত মমতায় ভর করে প্রতারকরা এই সুপরিকল্পিত জাল বিস্তার করেছে। আবেগতাড়িত হয়ে অনেক সময় তারা নিজেদের জমানো অর্থও এসব ভুয়া দাতব্য আবেদন বা পণ্য বিক্রির লিংকের পেছনে ব্যয় করে ফেলেন।
ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সাইবার অপরাধের এই অভিনব ধরনটি বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। বর্তমানে দেশের বিপুল সংখ্যক বয়স্ক মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন এবং ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত সময় কাটান। এরই মধ্যে দেশে ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে কিংবা মুমূর্ষু রোগীর ভুয়া ছবি দেখিয়ে সাহায্য তোলার নামে প্রতারণার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এখন জেনারেটিভ এআই টুলের সহজলভ্যতায় দেশীয় সাইবার অপরাধীরাও চাইলেই এমন নিখুঁত বাংলা ভাষার ভিডিও তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে পারে।
