সাইবার হামলার ঝুঁকিতে সাময়িক বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট



আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিমহলে ওয়েব ব্যাকএন্ড প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ পিএইচপি-র দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পরপরই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বন্ধ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। সম্ভাব্য কোনো সাইবার হামলা বা ডাটা ব্রিচের ঝুঁকি এড়াতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে তাদের অফিসিয়াল ওয়েব পোর্টালটি টেকনিক্যাল মেইনটেন্যান্সে পাঠায়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তাঝুঁকি বিশদভাবে মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় প্যাচ আপডেটের কাজ শেষে দ্রুতই পোর্টালটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য পুনরায় চালু করা হবে।

ওয়েব ডেভেলপমেন্টের জগতে অন্যতম জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত সার্ভার-সাইড স্ক্রিপ্টিং ভাষা হলো পিএইচপি (PHP)। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সমীক্ষায় এই ব্যাকএন্ড কোডিং সিস্টেমের গভীরে দুটি গুরুতর ত্রুটি (Zero-day Vulnerabilities) আবিষ্কৃত হয়। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছিদ্র বা লুপহোল ব্যবহার করে দূর থেকেই অসাধু হ্যাকাররা সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এমনকি তারা ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া কিংবা পুরো নেটওয়ার্ক অচল করে দেওয়ার মতো মারাত্মক অপকর্ম ঘটাতে সক্ষম।

এমন ভয়াবহ বৈশ্বিক হুমকির খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাইবার ইকোসিস্টেম সুরক্ষায় নড়েচড়ে বসে প্রযুক্তি দল। রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক তথ্যের স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে কোনো প্রকার ঝুঁকি না নেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়। ফলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা প্রিভেন্টিভ মেজারমেন্ট হিসেবে বন্ধ রাখা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, নিজস্ব সার্ভারে কোনো আক্রমণ ঘটেনি; বরং আন্তর্জাতিক এই হুমকির হাত থেকে আগাম রেহাই পেতেই ওয়েবসাইটটিকে অফলাইনে নিয়ে প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি প্যাচ ইনস্টল করার প্রক্রিয়া চলছে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি কোনো একক ব্যাংকের কারিগরি ব্যর্থতা বা আক্রমণ নয়। বিশ্বজুড়ে যেখানেই পিএইচপি ফ্রেমওয়ার্কভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ ডোমেইন ও সার্ভার রয়েছে, সেখানেই এখন একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বিশ্বের বহু শীর্ষস্থানীয় অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের প্ল্যাটফর্ম সাময়িক সময়ের জন্য ডাউন রেখে কোড রিফ্যাক্টরিং করছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাইবার ক্রিমিনালদের নজর সবসময়ই থাকে। অতীতের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকেও এবার শূন্য-ঝুঁকি নীতি মেনে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। প্রযুক্তিগত ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ইমার্জেন্সি আইসোলেশন’, ঠিক সেই পদ্ধতিতেই ওয়েব সার্ভারকে সাধারণ ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে।

হঠাৎ করে প্রবেশযোগ্যতা হারানোর কারণে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দেশের সাধারণ সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের মাঝে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়। ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মূল ব্যাংকিং ট্রানজ্যাকশনে কোনো বিঘ্ন ঘটছে কি না; তা নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এটি নিছকই একটি সাধারণ পাবলিক ওয়েবসাইটের কারিগরি বন্ধ অবস্থা। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কোর ব্যাংকিং সলিউশন (CBS) বা আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থার (যেমন- EFTN, RTGS, NPSB) সাথে ওয়েবসাইটের সরাসরি সংযোগ থাকে না। ফলে মূল আর্থিক লেনদেনে কোনো স্থবিরতা বা বিপদের আশঙ্কা নেই।