বিশ্বজুড়ে ঘরে খাবার-পানি মজুতের তাগিদ, কীসের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকারগুলো?



একটি বড় ঝড়, কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎবিভ্রাট কিংবা একটি শক্তিশালী সাইবার হামলা—যেকোনো একটি ঘটনায় থমকে যেতে পারে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বন্ধ হয়ে যেতে পারে পানি সরবরাহ, ব্যাহত হতে পারে ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং কার্যক্রম, এমনকি প্রয়োজনীয় খাবার ও ওষুধ সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিকদের ঘরে জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার।

কোনো দেশ বলছে তিন দিনের খাবার ও পানি রাখতে, কোনো দেশ এক সপ্তাহের, আবার কোথাও ১০ দিনের প্রস্তুতির কথা বলা হচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোতে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টিও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বজুড়ে কি নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, সরকারগুলোর এই প্রস্তুতি শুধু যুদ্ধের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতাও এর বড় কারণ।

আধুনিক জীবনে মানুষ প্রতিদিন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, পানি সরবরাহ, পরিবহন ও ব্যাংকিং সেবার ওপর নির্ভর করে। এসব পরিষেবার কোনো একটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও তৈরি হতে পারে বড় ধরনের ভোগান্তি।

এমন পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। দোকানপাট বন্ধ থাকলে খাবার সংগ্রহ কঠিন হতে পারে, বিদ্যুৎ না থাকলে মোবাইল ফোন ও অন্যান্য যোগাযোগযন্ত্র অচল হয়ে পড়তে পারে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নাগরিকদের নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী আগাম প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার। মূল ধারণা হলো, জরুরি পরিস্থিতির প্রথম কয়েক দিন যেন মানুষ সম্পূর্ণভাবে বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

দেশভেদে জরুরি প্রস্তুতির সময়সীমা আলাদা। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসে অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সুইডেন ও নরওয়ে নাগরিকদের প্রায় এক সপ্তাহ চলার মতো খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে বলেছে। জার্মানির নির্দেশনায় রয়েছে ১০ দিনের প্রস্তুতির কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দুর্যোগ প্রস্তুতি ওয়েবসাইট ‘রেডি ডট গভ’-এও কয়েক দিন চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার পরামর্শ রয়েছে। ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কথা বললেও সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করেনি।

এই পার্থক্যের কারণ মূলত দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্যোগের ধরন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

যুক্তরাজ্য সরকারের ‘বি রেডি’ প্রচারাভিযানে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। গত ২২ অক্টোবর শুরু হওয়া এই উদ্যোগে খাবার ও পানির পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে জরুরি হতে পারে এমন কয়েকটি সরঞ্জামের তালিকাও দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন মানুষের জন্য প্রতিদিন তিন লিটার পানীয় জল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক এবং ব্যাটারিচালিত অথবা হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও রাখা উচিত।

এসব সামগ্রী কেন প্রয়োজন, তারও ব্যাখ্যা রয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে টর্চলাইট কাজে আসবে, মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট অকার্যকর হলে রেডিও থেকে জরুরি তথ্য পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ওষুধ ও খাবার মজুত থাকলে বাইরের সরবরাহ বন্ধ হলেও পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে।

সরকারের পরামর্শ, একবারে অনেক কিছু কিনে ঘরে জমা করার প্রয়োজন নেই। বরং আগে থেকে থাকা জিনিসপত্রের তালিকা করে ঘাটতি অনুযায়ী ধীরে ধীরে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোর প্রস্তুতিতে এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি।

২০২৫ সালের মার্চে ইউরোপীয় কমিশন ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়।

ইউরোপীয় কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে সামরিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সাইবার নিরাপত্তার হুমকি, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

সুইডেনের প্রস্তুতিমূলক নির্দেশিকায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দেশটির নাগরিকদের এক সপ্তাহ চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।

তবে সুইডেনের এ ধরনের প্রস্তুতি নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধ ও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সাম্প্রতিক নির্দেশনায় পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

নাগরিকদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বানের পর যুক্তরাজ্যে জরুরি ব্যবহারের কয়েকটি পণ্যের বিক্রি বেড়েছে।

বিবিসির ‘নিউজ নাইট’ অনুষ্ঠানের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে এক সপ্তাহান্তে টিনজাত খাবারের বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বোতলজাত পানির বিক্রিও বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রবার্ট ডায়াস জানিয়েছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় তাদের রেডিও বিক্রি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ।

অন্যদিকে ম্যাপলিনের হিসাবে, সরকারি ঘোষণার পর তাদের রেডিও বিক্রি ৯২ শতাংশ, টর্চলাইট ২৮৪ শতাংশ এবং পাওয়ার ব্যাংক ১০৬ শতাংশ বেড়েছে। এখানে আগের মাসের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

তবে এই পরিসংখ্যান কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। ফলে যুক্তরাজ্যজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে কিংবা বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আইসল্যান্ড জানিয়েছে, তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

নাগরিকদের কয়েক দিনের প্রস্তুতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক স্থাপনাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

২ নভেম্বর দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের সহায়তা ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিকল্প ব্যবস্থা, সরবরাহব্যবস্থা, জরুরি মজুত এবং সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে এটি সামরিক স্থাপনাগুলোর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা। সাধারণ নাগরিকদের ৯০ দিনের খাবার মজুত করার কোনো নির্দেশনা নয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এসব উদ্যোগকে আসন্ন যুদ্ধ কিংবা বড় কোনো বিপর্যয়ের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং সরকারগুলো এমন পরিস্থিতির জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত করতে চাইছে, যখন স্বাভাবিক পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে বড় দুর্যোগের পর উদ্ধারকারী সংস্থা ও জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হয়। সে সময় পরিবারগুলো কয়েক দিন নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া সহজ হয়।

এ কারণে জরুরি যোগাযোগের নম্বর লিখে রাখা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং পরিবারের শিশু, বয়স্ক ও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন সদস্যদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।