দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবি: লাশের মিছিলে ভারী পদ্মার পাড়, উদ্ধার ২৪



গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত মোট ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জনের পরিচয় শনাক্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় রাজবাড়ীসহ সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


শোকাতুর জনপদ: প্রিয়জন হারানোর হাহাকার

ভোরের আলো ফোটার আগেই দৌলতদিয়া ঘাটে ভিড় জমেছিল স্বজনহারা মানুষের। কারো চোখে জল, কারো মুখে স্তব্ধতা। ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় একের পর এক নিথর দেহ যখন পানি থেকে তোলা হচ্ছিল, তখন পদ্মার পাড়ে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, উদ্ধার হওয়া ২৪ জনের মধ্যে ২১ জনকেই এরই মধ্যে চোখের জলে বিদায় জানিয়েছে তাদের পরিবার। বাকি তিনজনের মরদেহ, যাদের মধ্যে বাসের চালকও রয়েছেন, বর্তমানে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, প্রশাসন অত্যন্ত তৎপরতার সাথে পরিচয় শনাক্তকরণ এবং মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। তবে প্রতিটি লাশের সাথে বেরিয়ে আসছে একেকটি দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

নিহতদের পরিচয় ও প্রেক্ষাপট

নিহতদের তালিকায় শিশু ও নারীর সংখ্যা দেখে আঁতকে উঠছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়কের রেহেনা আক্তার ও তাঁর শিশুসন্তান আহনাফ তাহমিদ খানের মৃত্যু শোকের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। একইভাবে কুষ্টিয়ার মর্জিনা খাতুন, রাজীব বিশ্বাস কিংবা সজ্জনকান্দার জহুরা অন্তি ও কাজী সাইফের অকাল প্রয়াণ কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

তালিকায় থাকা শিশুদের নামগুলো পড়তে গিয়ে উদ্ধারকর্মীদেরও গলা ধরে আসছিল। ইস্রাফিল, ফাইজ শাহানূর, তাজবিদ কিংবা সাবিত হাসানের মতো মাসুম শিশুরা জানতও না যে মুহূর্তের অসতর্কতায় নদীই হয়ে উঠবে তাদের শেষ ঠিকানা। রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গোপালগঞ্জ এমনকি দূরবর্তী দিনাজপুর ও ঢাকার আশুলিয়া থেকেও মানুষ এই বাসে চড়ে গন্তব্যে ফিরছিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তছনছ করে দিয়েছে সব পরিকল্পনা।

দুর্ঘটনার কারণ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ

প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সরাসরি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়। তবে যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি চালকের অসতর্কতা—তা নিয়ে তদন্ত চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পন্টুনের প্রবেশপথে যথাযথ বেরিয়ার না থাকায় এ ধরনের ঝুঁকি বারবার তৈরি হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসন থেকে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই লাশের মিছিল থামবে কবে?

এক নজরে দুর্ঘটনার চিত্র:

  • মোট উদ্ধারকৃত মরদেহ: ২৪ জন।

  • হস্তান্তর করা হয়েছে: ২১ জনের মরদেহ।

  • হাসপাতালে সংরক্ষিত: চালকসহ ৩ জনের মরদেহ।

  • প্রভাবিত এলাকা: রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর ও ঢাকা।

  • উদ্ধার অভিযানে: ফায়ার সার্ভিস, নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সম্মিলিত দল।

নৌ-পথের এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার দশা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে শৃঙ্খলা ফেরানো এখন সময়ের দাবি। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হলেও, হারানো স্বজনদের শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ সম্ভব নয়।

ফেরিঘাটের আধুনিকায়ন এবং চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এমন দুর্ঘটনা রোধ করা প্রায় অসম্ভব। আজকের এই ২৪টি প্রাণ কেবল সংখ্যা নয়, ২৪টি সাজানো সংসারের স্বপ্নভঙ্গ।