ইরানে কি পারমাণবিক হামলা চালাবে ওয়াশিংটন?


ইরানে কি পারমাণবিক হামলা চালাবে ওয়াশিংটন?

ইরানে পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া তীব্র উত্তেজনার পারদ প্রশমিত করল মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হোয়াইট হাউস। তেহরানে কোনো ধরনের পারমাণবিক বোমা বর্ষণের পরিকল্পনা নাকচ করে দিয়ে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত থাকলেও তা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে ছিল না।


উত্তেজনার সূত্রপাত: ভ্যান্সের রহস্যময় মন্তব্য

মধ্যপ্রাচ্যের রণকৌশল যখন প্রতিনিয়ত রূপ বদলাচ্ছে, ঠিক তখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি মন্তব্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া কঠোর আলটিমেটাম কার্যকরের প্রসঙ্গে ভ্যান্স সম্প্রতি বলেছিলেন, মার্কিন বাহিনীর হাতে এমন কিছু বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে যা ‘এখনও ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি’।

তার এই অস্পষ্ট অথচ শক্তিশালী মন্তব্যকে অনেক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘পারমাণবিক হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান ছায়াযুদ্ধ যখন প্রকাশ্য রূপ নেওয়ার উপক্রম, তখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরমাণু শক্তির এমন ইঙ্গিত বিশ্বমঞ্চে আতঙ্ক তৈরি করে।

হোয়াইট হাউসের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও ব্যাখ্যা

তীব্র বিতর্ক ও জল্পনার মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটায় হোয়াইট হাউস। অত্যন্ত কঠোর ও কিছুটা অপ্রথাগত ভাষায় তারা এই গুজবের জবাব দেয়। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। পোস্টে সরাসরি সমালোচকদের আক্রমণ করে বলা হয়, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট যা বলেছেন তাতে “আক্ষরিক অর্থেই” এমন কিছুর (পারমাণবিক হামলা) আভাস নেই, ওহে নির্বোধের দল।’

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, ‘এখনও ব্যবহারের সিদ্ধান্ত না নেওয়া’ অস্ত্রের তালিকায় উন্নত সাইবার অস্ত্র, হাইপারসনিক মিসাইল কিংবা অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমা-নাগাসাকির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছে। মূলত কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখতেই ভ্যান্স এমন শব্দ চয়ন করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যা রয়েছে:

  • পারমাণবিক অবস্থান: যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা বাতিল করেছে।

  • ভ্যান্সের বক্তব্য: সামরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের ইঙ্গিত দিলেও তা পরমাণু কেন্দ্রিক নয়।

  • ট্রাম্পের আলটিমেটাম: ইরানকে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সামরিক প্রস্তুতির মহড়া দিচ্ছে পেন্টাগন।

  • কূটনৈতিক বার্তা: হোয়াইট হাউসের কড়া প্রতিক্রিয়া মূলত বৈশ্বিক শেয়ার বাজার ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা কমানোর একটি প্রচেষ্টা।


রণকৌশল বনাম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

ভূ-রাজনীতিবিদদের মতে, জেডি ভ্যান্সের এই ধরণের মন্তব্য মূলত একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বা সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ারের অংশ। শত্রুপক্ষকে চাপে রাখতে সব সময় তুরুপের তাস আড়ালে রাখা ওয়াশিংটনের পুরনো কৌশল। তবে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি যে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী ও সরাসরি, ভ্যান্সের কথাতেই তা পরিষ্কার।

ইরান অবশ্য মার্কিন এই হুমকিকে হম্বিতম্বি বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন কেবল আলোচনার টেবিলে সুবিধা পেতে এ ধরণের ভীতি প্রদর্শন করছে। তবে হোয়াইট হাউস যেভাবে সরাসরি ‘নির্বোধ’ সম্বোধন করে গুজব থামাতে মাঠে নেমেছে, তাতে বোঝা যায় যে বিশ্ব জনমত নিয়ে তারা এই মুহূর্তে বেশ সংবেদনশীল।