নির্ধারিত আট ঘণ্টার কর্মদিবস এখন কেবল কাগজে-কলমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণা এক ভয়াবহ সত্য সামনে এনেছে: অতিরিক্ত কাজ বা ‘ওভারটাইম’ এখন নীরব ঘাতক। সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতি আর প্রযুক্তির অবাধ প্রসারে অফিস এখন পকেটে ঘোরে। ফলে কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা মুছে গেছে। একসময় অতিরিক্ত পরিশ্রমকে সফলতার চাবিকাঠি মনে করা হলেও, বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান একে সরাসরি মৃত্যুর দাওয়াত হিসেবে দেখছে। সাংবাদিক হিসেবে গত দেড় দশকে আমি বহু পেশাজীবীকে দেখেছি যারা পদোন্নতি বা বাড়তি আয়ের নেশায় নিজের শরীরকে তুচ্ছজ্ঞান করেছেন। কিন্তু ডব্লিউএইচও এবং আইএলও-র এই প্রতিবেদন সেই সব ‘ওয়ার্কোহলিক’ বা কর্মপাগল মানুষদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।
মরণফাঁদ যখন ৫৫ ঘণ্টা
গবেষণার তথ্যমতে, ২০১৬ সালে দীর্ঘ সময় কাজের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি কর্মক্ষেত্রের অসুস্থ প্রতিযোগিতার এক নির্মম চিত্র। গবেষকরা দেখেছেন, যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন, তাদের তুলনায় ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করা ব্যক্তিদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি।
অতিরিক্ত কাজের চাপ শরীরে যে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ও শারীরিক চাপের (Stress) সৃষ্টি করে, তা সরাসরি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। অনিদ্রা, খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম এবং ব্যায়ামের অভাব এই ঝুঁকিকে আরও ত্বরান্বিত করে। বিশেষ করে মধ্যবয়সী পুরুষরা এই মরণব্যাধির শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করা এবং নিরবচ্ছিন্ন টেনশন শরীরের স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত করে, যা শেষ পর্যন্ত স্ট্রোকের দিকে ঠেলে দেয়।
এক নজরে গবেষণার মূল তথ্যসমূহ:
বিশাল মৃত্যুমিছিল: দীর্ঘ কর্মঘণ্টার প্রভাবে এক বছরেই স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ।
ঝুঁকির হার: সপ্তাহে ৫৫+ ঘণ্টা কাজ করলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত।
হৃদরোগের আশঙ্কা: স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার তুলনায় অতিরিক্ত কাজ করা ব্যক্তিদের হৃদরোগে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ১৭ শতাংশ বেশি।
লিঙ্গভেদ: গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ কাজের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ (প্রায় ৭২ শতাংশ) পুরুষ।
সংস্কৃতি বনাম স্বাস্থ্য
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও জটিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শ্রমের সস্তা বাজার এবং কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে বাধ্য করছে দীর্ঘ সময় ডেস্কে পড়ে থাকতে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা মনে করেন, দেরি করে অফিস ছাড়লে বসের সুনজরে আসা যাবে। এই ভ্রান্ত ধারণা ধীরে ধীরে তাদের শরীরকে ভেতর থেকে ক্ষয়ে দিচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে এই ‘টক্সিক’ বা বিষাক্ত প্রতিযোগিতার অবসান না ঘটলে ভবিষ্যতে এই মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজ করার সময় বাড়ানো নয়, বরং কাজের গুণগত মান এবং শ্রমিকের সুস্থতার ওপর জোর দেওয়া উচিত। একজন অসুস্থ বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কর্মী কখনোই প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনতে পারে না।
আগামীর পথ: ভারসাম্যই সমাধান
পরিশেষে বলতে হয়, ক্যারিয়ার বা অর্থ উপার্জন অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা যদি জীবনের বিনিময়ে হয়, তবে তার সার্থকতা কোথায়? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই প্রতিবেদনটি দেশগুলোর নীতিনির্ধারক এবং নিয়োগকর্তাদের জন্য একটি জরুরি সংকেত। কর্মঘণ্টা নির্ধারণে আইন কঠোর করা এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং বাধ্যতামূলক।

