ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে শিশুদের মধ্যে জ্বর ও শরীরে লালচে দানার প্রকোপ বাড়ছে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ হাম মনে হলেও এটি হতে পারে মারাত্মক ছোঁয়াচে ‘রুবেলা’। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য এটি কষ্টদায়ক হলেও গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে রুবেলা ডেকে আনতে পারে আজীবনের কান্না। তাই এই দুই রোগের পার্থক্য ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জানা এখন সময়ের দাবি।
হাম ও রুবেলা: গুলিয়ে ফেলছেন না তো?
সাধারণ মানুষের কাছে হাম এবং রুবেলা দেখতে অনেকটা একই মনে হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হাম (Measles) মূলত ‘মরবিলি’ ভাইরাসের কারণে হয়, যার তীব্রতা রুবেলার চেয়ে অনেক বেশি। হাম হলে রোগীর অনেক বেশি জ্বর থাকে এবং শরীর জুড়ে গাঢ় লাল রঙের র্যাশ বা দানা ওঠে।
অন্যদিকে, রুবেলাকে বলা হয় ‘জার্মান মিজেলস’। এটি ‘রুবেলা’ ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়। হামের তুলনায় এর তীব্রতা কিছুটা কম হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। রুবেলার র্যাশ সাধারণত গোলাপি আভার হয় এবং এটি হামের মতো অতটা স্থায়ী হয় না। তবে রুবেলার সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো এর ‘টেরাটোজেনিক’ ক্ষমতা, যা গর্ভস্থ শিশুর অপূরণীয় ক্ষতি করতে সক্ষম।
রুবেলার লক্ষণগুলো কী কী?
রুবেলা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও স্বাস্থ্য বিশ্লেষক হিসেবে আমি পাঠকদের নিচের লক্ষণগুলোর দিকে নজর দিতে বলব:
হালকা জ্বর: সাধারণত খুব বেশি জ্বর হয় না, তবে শরীরে ম্যাজম্যাজে ভাব থাকে।
গোলাপি র্যাশ: মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে সারা শরীরে গোলাপি রঙের সূক্ষ্ম দানা বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।
গ্রন্থি ফুলে যাওয়া: বিশেষ করে কানের পেছনে এবং ঘাড়ের লিম্ফ নোড বা গ্রন্থিগুলো ফুলে যায় এবং ব্যথা হতে পারে।
চোখ ওঠা: হালকা চোখ লাল হওয়া বা কনজাংটিভাইটিস দেখা দিতে পারে।
গিট ব্যথা: কিশোরী বা প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে হাত বা পায়ের গিঁটে ব্যথা হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
গর্ভাবস্থায় রুবেলা: একটি নীরব ঘাতক
রুবেলা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো গর্ভবতী মায়েদের নিয়ে। গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যদি কোনো নারী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তবে তাকে বলা হয় ‘কনজেনিটাল রুবেলা সিনড্রোম’ (CRS)। এর ফলে গর্ভস্থ শিশু অন্ধত্ব, বধিরতা (কানে না শোনা), হার্টের জন্মগত ত্রুটি এমনকি মস্তিষ্কের বিকলাঙ্গতা নিয়ে জন্মাতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাত বা মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকিও তৈরি হয়।
রুবেলা প্রতিরোধের বুলেট পয়েন্ট:
এই সংক্রামক ব্যাধি থেকে বাঁচতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরামর্শগুলো নিচে দেওয়া হলো:
টিকা দান: এমএমআর (MMR) বা এমআর (MR) টিকা রুবেলা প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায়। শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে এই টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
বিয়ের আগে সচেতনতা: সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করার আগেই কোনো নারীর রুবেলা প্রতিরোধী ক্ষমতা আছে কি না, তা পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। না থাকলে টিকা নিতে হবে।
আলাদা থাকা: আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৫ থেকে ৭ দিন অন্য শিশুদের থেকে আলাদা ঘরে রাখা প্রয়োজন।
পরিচ্ছন্নতা: হাঁচি-কাশির সময় রুমাল ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস সংক্রমণ ছড়ানো রোধ করে।
হাম এবং রুবেলাকে কেবল ‘সাধারণ জ্বর’ ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে রুবেলার ক্ষেত্রে প্রতিরোধই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রতিকার। সরকারের টিকাদান কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন এবং সামাজিক সচেতনতাই পারে একটি সুস্থ ও সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপহার দিতে।

