ভেঙে গেল আমিনুলের পর্ষদ, অ্যাডহক কমিটির নেতৃত্বে তামিম ইকবাল


ভেঙে গেল আমিনুলের পর্ষদ, অ্যাডহক কমিটির নেতৃত্বে তামিম ইকবাল

দেশের ক্রিকেটে এক মহাপ্রলয় ঘটে গেল আজ। আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। একইসঙ্গে দেশসেরা ওপেনার ও সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি শক্তিশালী অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে।


নির্বাচনী অনিয়মের চূড়ান্ত ফল

দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থায় গত কয়েক মাস ধরেই অস্থিরতার কালো মেঘ জমছিল। বিশেষ করে গত বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বিসিবি নির্বাচন নিয়ে জনমনে ছিল বিস্তর প্রশ্ন। আজ বিকেলে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ক্রীড়া পরিচালক আমিনুল এহসান আনুষ্ঠানিকভাবে পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নির্বাচনের ভয়াবহ সব অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্বাচনের তিনটি ক্যাটাগরিতে যে ২৩ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেকের পথেই ছিল অস্বচ্ছতা। ক্লাব প্রতিনিধি থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা—প্রতিটি স্তরেই ভোটাধিকার প্রয়োগ ও প্রার্থী নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর প্রমাণ পেয়েছে কমিটি। এমনকি এনএসসি থেকে মনোনীত দুই পরিচালকের নিয়োগ নিয়েও আইনি জটিলতা খুঁজে পেয়েছে তদন্তকারী দল। এই অনিয়মকে ‘ক্রিকেটের ভাবমূর্তির ওপর কুঠারাঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এনএসসির কর্মকর্তারা।

তামিমের কাঁধে গুরুদায়িত্ব

ক্রিকেট পাড়ায় সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়ে এসেছে তামিম ইকবালের নাম। মাঠের খেলায় এখনো সক্রিয় থাকলেও বোর্ডের সংকটকালীন এই মুহূর্তে হাল ধরতে রাজি হয়েছেন তিনি। ১১ সদস্যের এই অ্যাডহক কমিটিতে তামিমের সঙ্গী হিসেবে থাকছেন বেশ কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটার, ক্রীড়া সংগঠক ও আইন বিশেষজ্ঞ। বিসিবির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সক্রিয় বা সদ্য সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটারকে এমন বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হলো।

আমিনুল এহসানের দেওয়া তথ্যমতে, এই অ্যাডহক কমিটির মূল কাজ হবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে আইসিসির সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে জাতীয় দলের কার্যক্রম ও ঘরোয়া ক্রিকেটের সূচি ঠিক রাখা।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে:

এনএসসির প্রকাশিত প্রতিবেদনের মূল পয়েন্টগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ক্যাটাগরি-১ (জেলা ও বিভাগ): কাউন্সিলরশিপ বন্টনে নজিরবিহীন কারচুপি এবং বিরোধী প্যানেলের প্রার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রমাণ।

  • ক্যাটাগরি-২ (ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ): ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার এবং প্রক্সি ভোটের উপস্থিতি।

  • ক্যাটাগরি-৩ (এনএসসি ও অন্যান্য): যোগ্যতার মাপকাঠি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালক পদে নিয়োগ।

  • আর্থিক অসঙ্গতি: নির্বাচন পরিচালনার জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের যথেচ্ছ ব্যবহার ও ভুয়া ভাউচারের উপস্থিতি।


সংস্কারের পথে দেশের ক্রিকেট

আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ ভেঙে দেওয়াকে দেশের ক্রিকেট প্রেমীরা ‘শুদ্ধি অভিযান’ হিসেবেই দেখছেন। গত কয়েক বছরে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বিসিবির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বেশি আলোচনায় ছিল। সেই অচলাবস্থা ভাঙতেই এনএসসির এই কঠোর হস্তক্ষেপ। তবে আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে বিসিবি কোনো নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে কি না, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

যদিও এনএসসি কর্মকর্তাদের দাবি, এটি কোনো সরকারি হস্তক্ষেপ নয়, বরং নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার। বিচারপতি আসাদুজ্জামানের তদন্ত প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলেও (আইসিসি) পাঠানো হবে বলে জানা গেছে, যাতে করে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।