বড়দেরও হচ্ছে হাম: অবহেলা ডেকে আনতে পারে চরম ঝুঁকি!


বড়দেরও হচ্ছে হাম: অবহেলা ডেকে আনতে পারে চরম ঝুঁকি!

হাম মানেই কি কেবল শিশুদের রোগ? প্রচলিত এই ধারণাটি এখন চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হামের প্রকোপ এবং জটিলতা উভয়ই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে শৈশবে টিকা না নেওয়া বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের জন্য এই ভাইরাস এখন বড় দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভুল ধারণা ও বর্তমান বাস্তবতা

আমাদের সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, হাম কেবল শিশুদের হয় এবং একবার হয়ে গেলে আর হওয়ার ভয় নেই। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ‘প্যারামিক্সোভাইরাস’ নামক অতি সংক্রামক এই শত্রুটি বয়স চিনে আক্রমণ করে না। বড়দের ক্ষেত্রে যখন এই সংক্রমণ ঘটে, তখন তা শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। চিকিৎসকদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা শৈশবের তুলনায় ভিন্নভাবে কাজ করে, যা অনেক সময় তীব্র শারীরিক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কেন বড়রা বেশি ঝুঁকিতে?

অনেকেই প্রশ্ন করেন, ছোটবেলায় তো টিকা নিয়েছিলাম, তবে এখন কেন? এর প্রধান কারণ হলো ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি। যারা শৈশবে হামের টিকার (MR Vaccine) দুটি ডোজ পূর্ণ করেননি অথবা যাদের শরীরে বয়সজনিত কারণে অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে গেছে, তারা এই ভাইরাসের সহজ লক্ষ্যবস্তু। এছাড়া বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমছে, যা হামের ভাইরাসকে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

বড়দের হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ সর্দি-জ্বর বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মনে হলেও এর বিস্তার অত্যন্ত দ্রুত। উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, শরীরজুড়ে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি এবং মুখে সাদাটে দাগ (কপ্লিক স্পটস) দেখা দিলে মোটেও দেরি করা উচিত নয়।

জটিলতা যখন প্রাণঘাতী

শিশুদের হাম সাধারণত সপ্তাহখানেকের মধ্যে সেরে গেলেও বড়দের ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, লিভারের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিসের (মস্তিষ্কের প্রদাহ) মতো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি আরও বিপজ্জনক; গর্ভাবস্থায় হাম হলে অকাল গর্ভপাত বা নবজাতকের জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি প্রবল থাকে।

আক্রান্ত হলে কী করবেন?

হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ নেই, তবে সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

  • বিচ্ছিন্ন থাকা: হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্তত ১০ দিন আলাদা ঘরে রাখুন এবং বাড়ির শিশু ও বয়স্কদের থেকে দূরে রাখুন।

  • বিশ্রাম ও পুষ্টি: প্রচুর পরিমাণে পানি, ফলের রস এবং ডাবের পানি পান করতে হবে। জ্বরের তীব্রতা কমাতে প্যারাসিটামল এবং শরীর স্পঞ্জ করা জরুরি।

  • ভিটামিন-এ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ গ্রহণ হামের জটিলতা কমিয়ে দেয়।

  • ত্বকের যত্ন: র‍্যাশ চুলকাবেন না; এতে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হতে পারে। নিমপাতা মেশানো হালকা গরম পানিতে শরীর মোছা যেতে পারে।

প্রতিরোধই সেরা পথ

চিকিৎসকদের মতে, হাম প্রতিরোধের একমাত্র হাতিয়ার হলো এমএমআর (MMR) টিকা। যারা নিশ্চিত নন যে ছোটবেলায় টিকা নিয়েছেন কি না, তারা রক্ত পরীক্ষার (Antibody test) মাধ্যমে শরীরের অবস্থা জেনে নিতে পারেন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পুনরায় টিকার বুস্টার ডোজ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

পরিশেষে, হাম কেবল একটি সাধারণ চর্মরোগ বা শিশুদের জ্বর নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি সাইলেন্ট কিলার হতে পারে যদি বড়রা সচেতন না হন।