হাড় মজবুত করতে ক্যালসিয়ামের বিকল্প নেই—এই ধারণা আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম রক্তে প্রয়োজনের তুলনায় বেড়ে গেলে তা শরীরের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ‘হাইপারক্যালসেমিয়া’ নামক এই জটিলতা বর্তমানে অনেক মানুষের অজান্তেই বড় ধরণের শারীরিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত যখন বিপদের কারণ
শরীরের হাড় গঠন, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান এবং হৃদপিণ্ডের ছন্দ ঠিক রাখতে ক্যালসিয়াম অপরিহার্য। কিন্তু রক্তে এর মাত্রা যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় হাইপারক্যালসেমিয়া (Hypercalcemia)। সাধারণত প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির অতি-সক্রিয়তা, ভিটামিন-ডি এর মাত্রাতিরিক্ত সেবন কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে এই সমস্যার সূত্রপাত হয়।
আমাদের দেশে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। এই প্রবণতা হাইপারক্যালসেমিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন রক্তে ক্যালসিয়ামের আধিক্য ঘটে, তখন কিডনি সেই অতিরিক্ত অংশ ছেঁকে বের করতে হিমশিম খায়, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে শরীরের প্রতিটি প্রধান অঙ্গে।
নীরব ঘাতক: লক্ষণ যখন অস্পষ্ট
হাইপারক্যালসেমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো এতই সাধারণ যে, অনেকে একে সাধারণ ক্লান্তি বলে ভুল করেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও হৃদযন্ত্রের বড় ধরণের ক্ষতি করতে পারে। এর প্রধান প্রভাবগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
কিডনির ওপর চাপ: অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম শরীর থেকে বের করতে গিয়ে কিডনিকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে ঘনঘন তৃষ্ণা পাওয়া এবং অতিরিক্ত প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্রে এটি কিডনিতে পাথর জমার অন্যতম প্রধান কারণ।
পরিপাকতন্ত্রের গোলযোগ: রক্তে ক্যালসিয়াম বাড়লে পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। অনেক সময় এটি পেপটিক আলসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ু: উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়াম স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে দেয়। এর ফলে বিভ্রান্তি, অলসতা, বিষণ্নতা এমনকি স্মৃতিভ্রমের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
হৃদরোগের ঝুঁকি: ক্যালসিয়াম হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেত চলাচলে প্রভাব ফেলে। ফলে হৃদস্পন্দনের ছন্দ অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে (Arrhythmia), যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এক নজরে হাইপারক্যালসেমিয়ার মূল কারণ ও প্রতিকার
চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতাই এই সমস্যা থেকে মুক্তির প্রধান পথ। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমাদের মনে রাখা জরুরি:
প্যারাথাইরয়েড পরীক্ষা: থাইরয়েড গ্রন্থির পেছনে থাকা ছোট চারটি প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করলে হাড় থেকে ক্যালসিয়াম রক্তে চলে আসে। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এর মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত।
সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারে সতর্কতা: ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন-ডি এর ট্যাবলেট খাওয়ার আগে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা (Serum Calcium Test) করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
পর্যাপ্ত পানি পান: কিডনির কার্যকারিতা সচল রাখতে এবং অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বের করে দিতে দিনে অন্তত ২-৩ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন।
খাদ্যাভ্যাস: প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন—দুধ, দই বা শাকসবজি শরীরের জন্য নিরাপদ, কারণ শরীর এখান থেকে কেবল প্রয়োজনীয় অংশটুকুই গ্রহণ করে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও আগামীর বার্তা
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক জীবনযাত্রায় আমরা অনেক সময় না জেনেই শরীরের ওপর রাসায়নিক ধকল চাপিয়ে দিই। ক্যালসিয়াম কমে যাওয়া যেমন হাড়ের ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিস ঘটায়, তেমনি এর আধিক্য শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে বিকল করে দিতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে ক্যালসিয়ামের মাত্রার ওপর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, শরীরের সুস্থতার চাবিকাঠি হলো ‘ভারসাম্য’। বিজ্ঞাপনের চটকদারিতে প্রলুব্ধ হয়ে বা নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা আত্মঘাতী হতে পারে।
আপনার শরীরে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, তা নির্ধারণের ভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ওপরই ছেড়ে দিন। মনে রাখবেন, পরিমিত ক্যালসিয়াম আপনাকে দেবে মজবুত হাড়, আর অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম আপনার জীবনকে ঠেলে দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে।

