সকালের নাস্তা বা রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস দুধ আমাদের সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং প্রোটিনের সমৃদ্ধ উৎস হওয়া সত্ত্বেও বাজারে ভেজাল দুধের রমরমা ব্যবসা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুষ্টিকর এই পানীয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের মেশানো রাসায়নিক এখন সাধারণ মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
সাদা দুধের আড়ালে কালচে ষড়যন্ত্র
দুধকে বলা হয় ‘সুপারফুড’। বিশেষ করে শিশুদের হাড়ের গঠন এবং বয়স্কদের ক্ষয়পূরণে এর কোনো বিকল্প নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুধে ভেজাল মেশানোর এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা দুধের ঘনত্ব বাড়াতে বা দীর্ঘক্ষণ টাটকা দেখাতে যোগ করছে স্টার্চ, ইউরিয়া, এমনকি ডিটারজেন্টের মতো মারাত্মক সব রাসায়নিক।
সাংবাদিকতা জীবনে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে কেবল পানি মিশিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না অসাধু চক্র। দুধের স্থায়িত্ব বাড়াতে ফরমালিন এবং হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের মতো বিপজ্জনক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
কেন এই ভেজাল এবং এর প্রভাব
দুধের চাহিদা ও যোগানের বিশাল পার্থক্যের সুযোগ নিচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী। সিন্থেটিক দুধ তৈরির মাধ্যমে তারা বাজার দখল করছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ভেজাল দুধ পান করার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে পেটের সমস্যা বা বমিভাব হতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও ভয়াবহ। নিয়মিত এই রাসায়নিক যুক্ত দুধ পান করলে কিডনি বিকল হওয়া, লিভারের দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং এমনকি মরণব্যাধি ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
ভেজাল শনাক্ত করার সহজ উপায়
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনি ঘরে বসেই পরীক্ষা করে নিতে পারেন আপনার কেনা দুধটি খাঁটি কি না। নিচে কিছু জরুরি তথ্য দেওয়া হলো:
স্বাদ ও গন্ধ: খাঁটি দুধের স্বাদ হালকা মিষ্টি হয়। যদি দুধে কোনো উগ্র রাসায়নিক গন্ধ পান, তবে সেটি এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
হাতের তালুতে ঘর্ষণ: হাতের তালুতে সামান্য দুধ নিয়ে ঘষলে যদি সাবানের মতো পিচ্ছিল বা ফেনা অনুভূত হয়, তবে নিশ্চিতভাবে তাতে ডিটারজেন্ট মেশানো হয়েছে।
রঙের পরিবর্তন: দুধ সেদ্ধ করার পর যদি সেটি হলদেটে হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে এতে ভেজাল হিসেবে স্টার্চ বা কার্বোহাইড্রেট মেশানো হয়েছে।
আয়োডিন টেস্ট: সামান্য দুধে কয়েক ফোঁটা আয়োডিন মিশিয়ে দেখুন। যদি দুধের রঙ নীল হয়ে যায়, তবে বুঝবেন এতে ভাতের মাড় বা আটা মেশানো আছে।
সরকারি নজরদারি ও আগামীর ভাবনা
বিএসটিআই (BSTI) এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান চালালেও গ্রামগঞ্জ থেকে শহরে দুধ পৌঁছানোর এই দীর্ঘ চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারির অভাব স্পষ্ট। কেবল জরিমানা বা স্বল্পমেয়াদী কারাদণ্ড দিয়ে এই জীবনঘাতী ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি দুগ্ধ উৎপাদন কেন্দ্রে এবং পাইকারি বাজারে নিয়মিত ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

