দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা এখন আকাশচুম্বী। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়।
সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেন, যা দেশের আর্থিক খাতের ভঙ্গুর চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সংসদে অর্থমন্ত্রীর তথ্য প্রকাশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের নবম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এই তথ্য জানানো হয়। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত স্থিতিভিত্তিক এই হিসাব তুলে ধরেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উত্থাপিত হয়।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, ব্যাংকিং খাতের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এখন আদায় অযোগ্য বা মন্দ ঋণের তালিকায় চলে গেছে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটের এক ভয়াবহ ইঙ্গিত। বছরের পর বছর ধরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করার সংস্কৃতি এবং তদারকির অভাবই আজ এই পাহাড়সম বোঝা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকা ও প্রভাব
অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী দেশের শীর্ষ ২০টি ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকাও পেশ করেন। যদিও সংসদীয় রীতি অনুযায়ী অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের নাম বিস্তারিত প্রকাশে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়, তবে এবারের অধিবেশনে শীর্ষ নামগুলো প্রকাশের মাধ্যমে সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের হাতেই আটকে আছে খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় বড় করপোরেট হাউজ এবং প্রভাবশালী মহলের নেওয়া ঋণ আদায় না হওয়ায় সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ বিতরণে হিমশিম খাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। খেলাপি ঋণের এই বিশাল অংক আদায়ের জন্য আইনি প্রক্রিয়া এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে সংসদে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চিত্রের মূল তথ্যসমূহ:
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে দেশের ঋণ পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
মোট খেলাপি ঋণ: ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
হিসাবের সময়কাল: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত স্থিতি ভিত্তিক।
শীর্ষ তালিকা: দেশের শীর্ষ ২০টি ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা সংসদে উত্থাপিত।
সংসদীয় প্রক্রিয়া: নবম দিনে লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী কর্তৃক তথ্য প্রদান।
সংকট উত্তরণে করণীয় ও আইনি জটিলতা
দেশের ব্যাংকিং খাতের এই ক্যান্সার সদৃশ সমস্যা দূর করতে কেবল তথ্য প্রকাশই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অর্থঋণ আদালতে ঝুলে থাকা হাজার হাজার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা এখন সময়ের দাবি। অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সরকার খেলাপি ঋণ আদায়ে আপসহীন ভূমিকা পালন করবে এবং ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনি মারপ্যাঁচে বড় খেলাপিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। এই সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা যদি আদায় করা সম্ভব হতো, তবে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হতো।
সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার এই খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ‘টাইম বোম’ হিসেবে কাজ করছে। সোমবার সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া এই তথ্য দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশের পর সরকার তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

