মার্চের আন্তর্জাতিক বিরতিতে ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের রাজত্ব ফিরে পেয়েছে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স। তবে বিশ্বকাপের প্রাক্কালে এই শীর্ষস্থান ফরাসি শিবিরে আনন্দের চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনীভূত করছে, কারণ ইতিহাসের এক অমোঘ ‘অভিশাপ’ এখন তাদের পিছু তাড়া করছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনা ও স্পেনকে টপকে আবারও ফুটবলের মসনদে বসেছে ‘লে ব্লুজ’রা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের পর এই প্রথম কিলিয়ান এমবাপ্পেরা বিশ্বসেরার মুকুট পরলেন। কিন্তু এই প্রাপ্তি কি শুধুই গাণিতিক উৎকর্ষ, নাকি আসন্ন বড় টুর্নামেন্টের আগে কোনো অশনি সংকেত? ফুটবল ইতিহাসের পাতা উল্টালো দেখা যায়, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কোনো দলই আজ পর্যন্ত সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে পারেনি।
ইতিহাসের সেই ‘র্যাঙ্কিং অভিশাপ’
ফুটবল বিশ্বে একটি অলিখিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর পরিসংখ্যান হলো ‘নাম্বার ওয়ান কার্স’ বা এক নম্বর দলের অভিশাপ। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৩ সালে ফিফা র্যাঙ্কিং প্রবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দলই এক নম্বর অবস্থানে থেকে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। ১৯৯৪ সালে জার্মানি, ১৯৯৮ সালে ব্রাজিল, ২০০২ সালে ফ্রান্স নিজে, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৮ ও ২০২২ সালের আসরগুলোতেও এই ধারার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
ফ্রান্সের জন্য এটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ ২০০২ সালের আসরে তারা যখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এবং বিশ্বসেরা দল হিসেবে মাঠে নেমেছিল, তখন গ্রুপ পর্ব থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। দিদিয়ের দেশম নিজেও জানেন, এই চড়া মূল্য দিতে হতে পারে মাঠের সামান্যতম ঢিলেঢালাভাবে।
মাঠের পারফরম্যান্সে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স
অভিশাপের ভয় থাকলেও মাঠের খেলায় ফ্রান্স এখন ফর্মের তুঙ্গে। মার্চের প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং কলম্বিয়ার রক্ষণকে চুরমার করে দেওয়া জয় প্রমাণ করে যে, এই দলটি কতটা ভারসাম্যপূর্ণ। আন্তোয়ান গ্রিজম্যানের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ এবং এমবাপ্পের বিধ্বংসী গতি যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য যমদূত।
এদিকে ফিফার হালনাগাদ র্যাঙ্কিংয়ে বড় পরিবর্তনের মধ্যে স্পেন ও আর্জেন্টিনার অবনমন উল্লেখযোগ্য। আর্জেন্টিনা সাম্প্রতিক কিছু ম্যাচে পয়েন্ট হারানোয় তাদের শীর্ষস্থান খোয়াতে হয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা সুখকর নয়। এক ধাপ পিছিয়ে জামাল ভূঁইয়ারা এখন ১৮১তম স্থানে।
একনজরে ফিফা র্যাঙ্কিং ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
শীর্ষ দল: ফ্রান্স (দীর্ঘ ৬ বছর পর শীর্ষে প্রত্যাবর্তন)।
অবনমন: আর্জেন্টিনা ও স্পেন এক ধাপ করে নিচে নেমেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান: ১৮১তম (পূর্বের চেয়ে এক ধাপ অবনতি)।
ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট: ১৯৯৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত কোনো ‘নাম্বার ওয়ান’ দল বিশ্বকাপ জেতেনি।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ফর্ম: টানা দুই ম্যাচে লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও কলম্বিয়াকে হারানো।
দেশমের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
সাংবাদিক সম্মেলনে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম কিছুটা সাবধানী মেজাজেই ধরা দিলেন। তিনি জানেন, র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা মানেই সারা বিশ্বের আতশিকাঁচের নিচে থাকা। প্রতিপক্ষ দলগুলো এখন ফ্রান্সকে হারানোর জন্য বাড়তি পরিকল্পনা সাজাবে। এছাড়া ইনজুরি সমস্যা কাটিয়ে মূল স্কোয়াডকে ফিট রাখাটাও তার জন্য বড় পরীক্ষা।
ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন, ফ্রান্সের এই দলটি ইতিহাসের সেরা দলগুলোর একটি। তাদের স্কোয়াড গভীরতা এবং বেঞ্চের শক্তি অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা। যেখানে পরিসংখ্যান আর ইতিহাস প্রায়ই যৌক্তিকতাকে হার মানায়।
পরিশেষে বলা যায়, ফ্রান্সের এই সিংহাসন আরোহণ কি তাদের জন্য নতুন এক ইতিহাসের সূচনা করবে, নাকি তারা সেই পুরনো ‘অভিশাপের’ জালে আটকে যাবে?

