জেনে নিন স্যান্ডো গেঞ্জির নামকরণের ইতিহাস!


জেনে নিন স্যান্ডো গেঞ্জি নামকরণে ইতিহাস!

আমাদের প্রতিদিনের পোশাকে এমন কিছু নাম জড়িয়ে আছে, যার উৎস সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। প্রচণ্ড গরমে আরামদায়ক যে ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ বাঙালির ড্রয়ারে অবধারিতভাবে থাকে, তার নামের পেছনে লুকিয়ে আছে ১৮ শতকের এক কিংবদন্তি জার্মান বডিবিল্ডারের রোমাঞ্চকর ইতিহাস। আধুনিক বডিবিল্ডিংয়ের জনক ইউজেন স্যান্ডোর নাম থেকেই এই পোশাকের নামকরণ।


ইতিহাসের পাতা থেকে: কে এই ইউজেন স্যান্ডো?

১৮৬৭ সালে তৎকালীন প্রুশিয়ায় (বর্তমান জার্মানি) জন্মগ্রহণ করেন ফ্রিডরিখ উইলহেম মুলার, যিনি পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ইউজেন স্যান্ডো নামে পরিচিতি পান। তাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম ‘শো-ম্যান বডিবিল্ডার’। সেই যুগে যখন পেশিবহুল শরীরের ধারণা আজকের মতো জনপ্রিয় ছিল না, তখন স্যান্ডো তার নিখুঁত শারীরিক গঠন দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

স্যান্ডো কেবল একজন শরীরচর্চাবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী বিপণনকারী। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মানুষ তার পেশির সঞ্চালন দেখতে পছন্দ করে। নিজের শারীরিক সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য তিনি মঞ্চে এক বিশেষ ধরনের হাতাকাটা ও আঁটসাঁট পোশাক পরতেন। এই পোশাকটি তার সুঠাম কাঁধ এবং বুকের পেশিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলত। ধারণা করা হয়, এই হাতাকাটা বিশেষ পোশাকটিই কালক্রমে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ নামে স্থায়ী আসন করে নেয়।

আধুনিক বডিবিল্ডিংয়ের বিবর্তন ও স্যান্ডো প্রভাব

স্যান্ডো যখন লন্ডনে স্থায়ী হলেন, তখন তিনি শরীরচর্চাকে একটি বিজ্ঞানসম্মত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ১৯০১ সালে তিনি বিশ্বের প্রথম বড় আকারের বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। তার এই উদ্যোগের ফলেই আজ আমরা যে অলিম্পিয়া বা মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার রমরমা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।

তার জনপ্রিয়তার জোয়ারে তিনি নিজের নামে জিমনেসিয়াম, স্বাস্থ্য সাময়িকী এবং ব্যায়ামের সরঞ্জাম বাজারজাত করতে শুরু করেন। গবেষকদের মতে, ব্রিটিশ শাসনামলে স্যান্ডোর এই সুঠাম দেহের ছবি এবং তার পোশাকের ধরন ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে স্যান্ডোর মতো হাতাকাটা গেঞ্জি পরার চল শুরু হয়, যা আজও ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ নামেই আমাদের মুখে মুখে ফেরে।

স্যান্ডো গেঞ্জি নিয়ে কিছু আকর্ষণীয় তথ্য

  • নামের উৎপত্তি: ইউজেন স্যান্ডোর নামানুসারেই এই অন্তর্বাসের নামকরণ করা হয়েছে বলে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ একমত।

  • পোশাকের বিবর্তন: এটি মূলত রেসলার বা কুস্তিগীরদের পোশাক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছিল যাতে হাত নাড়াচাড়ায় কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়।

  • সাংস্কৃতিক প্রভাব: বাঙালি ঘরে বড়দের ক্যাজুয়াল পোশাক বা ছোটদের স্কুলের ইউনিফর্মের নিচে স্যান্ডো গেঞ্জি আজও অপরিহার্য।

  • গ্লোবাল আইকন: স্যান্ডো এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে, আজও বডিবিল্ডিং জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘মিস্টার অলিম্পিয়া’ ট্রফিটি তার অবয়বেই তৈরি করা হয়।


ঐতিহ্যের এক পশলা বাতাস

ইউজেন স্যান্ডো ১৯২৫ সালে মারা গেলেও, তার নাম মিশে গেছে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে। তিনি শরীরচর্চাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তার প্রতিচ্ছবি আজও দেখা যায় প্রতিটি জিমনেসিয়ামে। আর আমাদের আলমারিতে পড়ে থাকা সাধারণ স্যান্ডো গেঞ্জিটি নীরবে মনে করিয়ে দেয় এক প্রবাদপ্রতিম বীরের কথা, যিনি শরীরকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

আজকের ফ্যাশন সচেতন যুগে শত পরিবর্তন এলেও, ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ তার নামের মহিমা ও উপযোগিতা বজায় রেখে এক অবিনশ্বর ব্র্যান্ড হিসেবে টিকে আছে। এটি কেবল একটি সুতির কাপড় নয়, বরং এটি শরীরচর্চার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।