ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসংলগ্ন অবস্থান ও হরমুজ প্রণালিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের আহ্বানের তীব্র সমালোচনা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে ম্যাক্রোঁ সাফ জানিয়েছেন, বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্ব পেতে হলে কথাবার্তায় ধারাবাহিকতা ও বাস্তববোধ থাকা জরুরি।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন ট্রাম্পের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আটলান্টিকের দুই পাড়ের মিত্রদের মধ্যে ফাটল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি সামরিক শক্তির মাধ্যমে দখল বা উন্মুক্ত করার যে পরিকল্পনা হোয়াইট হাউস সাজাচ্ছে, তাকে স্রেফ হঠকারী বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এলিসি প্রাসাদের অধিপতি।
দক্ষিণ কোরিয়া সফররত ফরাসি প্রেসিডেন্ট বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সামনে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতাগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের সমাধান সামরিক শক্তিতে নয়, বরং কূটনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে নিহিত। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ক্ষোভ এবং মিত্রদের প্রতি তাঁর নির্দেশের প্রতিক্রিয়ায় ম্যাক্রোঁ এই কড়া মন্তব্য করেন।
সামরিক পেশিবাদ বনাম বাস্তবসম্মত কূটনীতি
সম্প্রতি এক টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্প বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, কেন মিত্রদেশগুলো ইরান ইস্যুতে তাঁকে সমর্থন দিচ্ছে না। এরপরই তিনি অন্যান্য দেশগুলোকে সরাসরি নির্দেশ দেন হরমুজ প্রণালিতে গিয়ে অবস্থান নিতে। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় শুধু আমেরিকার নয়। কিন্তু ম্যাক্রোঁ মনে করেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
ম্যাক্রোঁর মতে, জোরপূর্বক কোনো আন্তর্জাতিক জলপথ সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং এর ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। তিনি মনে করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার একমাত্র পথ হলো নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসা। ইরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং পরমাণু চুক্তির মতো ইস্যুগুলোতে সমন্বয় না করে সামরিক হানা দিলে পুরো অঞ্চল দাবানলের মতো জ্বলে উঠতে পারে।
নিরাপত্তার নতুন ফর্মুলা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট অবশ্য সম্পূর্ণ হাত গুটিয়ে বসে থাকার কথা বলেননি। তিনি সুরক্ষার খাতিরে একটি ‘আশ্বাসমূলক মিশন’ বা রিঅ্যাসুরেন্স মিশনের প্রস্তাব দিয়েছেন। যেখানে সামরিক বাহিনী সরাসরি আক্রমণে না গিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে এটি হতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐকমত্যের ভিত্তিতে, কোনো একতরফা নির্দেশে নয়।
ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান: মিত্রদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি মুক্ত করার নির্দেশ।
ম্যাক্রোঁর পাল্টা যুক্তি: সামরিক অভিযানকে ‘অবাস্তব’ ঘোষণা করে কূটনৈতিক আলোচনার ওপর জোর প্রদান।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব: বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড।
ম্যাক্রোঁর প্রস্তাব: বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য একটি সুরক্ষামূলক মিশন পরিচালনা করা, যা হবে মূলত সতর্কতামূলক।
কূটনৈতিক বার্তা: ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণের সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান।
ভবিষ্যতের গতিপথ কোন দিকে?
বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাক্রোঁর এই বক্তব্য কেবল ফ্রান্সের অবস্থান নয়, বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশের মনোভাবের প্রতিফলন। জার্মানি এবং ব্রিটেনও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। ট্রাম্পের ‘একেক দিন একেক কথা’ বলার যে সমালোচনা ম্যাক্রোঁ করেছেন, তা মূলত ওয়াশিংটনের প্রতি প্যারিসের আস্থার সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।
পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই দড়িটানাটানি কেবল ইরান আর আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বিশ্ব মোড়লদের মধ্যে মতাদর্শিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ম্যাক্রোঁর এই কড়া অবস্থান কি ট্রাম্পকে আলোচনার পথে ফেরাতে পারবে, নাকি ওয়াশিংটন নিজের জেদ বজায় রেখে বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

