প্রকৃতির চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী আমরা জানি, ১২ ঘণ্টার দিন শেষে সূর্য অস্ত যায়, আসে ১২ ঘণ্টার আঁধার। কিন্তু বিস্ময়কর এই পৃথিবীতে এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে ঘড়ির কাঁটা মাঝরাত পেরোলেও আকাশ থাকে রৌদ্রোজ্জ্বল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসব দেশে সূর্য একেবারেই অস্ত যায় না।
নিশীথ সূর্যের রহস্য:
সাধারণত বিষুবরেখা থেকে দূরবর্তী মেরু অঞ্চলগুলোতে এই অদ্ভুতুড়ে মহাজাগতিক দৃশ্য দেখা যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মিডনাইট সান’ বা নিশীথ সূর্য। পৃথিবী তার কক্ষপথে ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকার কারণে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো গ্রীষ্মকালে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। ফলে সুমেরু বৃত্তের উত্তরের দেশগুলোতে সূর্য দিগন্তরেখার নিচে নামে না। ফলে ঘড়িতে রাত ১২টা বাজলেও চারপাশ থাকে গোধূলির মতো উজ্জ্বল বা ভরদুপুরের মতো তপ্ত।
যেসব দেশে রাতের অস্তিত্ব মুছে যায়
এমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে হলে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে উত্তর গোলার্ধের নির্দিষ্ট কিছু দেশে। চলুন দেখে নেওয়া যাক সেই তালিকার শীর্ষ দেশগুলো:
নরওয়ে: নরওয়েকে বলা হয় ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’। দেশটির উত্তর দিকে অবস্থিত সোভালবার্ডে ১০ এপ্রিল থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সূর্য কখনোই অস্ত যায় না। অর্থাৎ টানা কয়েক মাস সেখানে কোনো অন্ধকার নেই।
আইসল্যান্ড: ইউরোপের এই সুন্দর দ্বীপে গ্রীষ্মকালে রাত হয় না বললেই চলে। বিশেষ করে জুন মাসে উত্তর আইসল্যান্ডের আকুরেইরি এবং গ্রিমসে দ্বীপে সূর্য দিগন্তের নিচে যায় না।
কানাডা: উত্তর-পশ্চিম কানাডার নুনাভুত বা ইউকন এলাকায় গ্রীষ্মের টানা ৫০ থেকে ৬০ দিন সূর্যের দেখা মেলে। এখানকার বাসিন্দারা মাঝরাতেও দিব্যি রোদে ঘুরে বেড়াতে পারেন।
ফিনল্যান্ড: হাজার হ্রদের এই দেশে গ্রীষ্মকালে টানা ৭৩ দিন সূর্য তার তেজ ধরে রাখে। এখানকার মানুষ এই দীর্ঘ দিনকে কাজে লাগিয়ে হাইকিং বা আউটডোর অ্যাক্টিভিটিতে মেতে থাকে।
সুইডেন: সুইডেনের উত্তর অংশে মে মাসের শেষ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত সূর্য ডোবে না। রাজধানী স্টকহোমেও এই সময়ে মধ্যরাতে কেবল হালকা গোধূলির আভা দেখা যায়।
জনজীবনে প্রভাব:
টানা দিন থাকার বিষয়টি শুনতে রোমাঞ্চকর মনে হলেও, স্থানীয়দের জীবনে এর প্রভাব বেশ গভীর। যখন ঘড়িতে রাত ২টা কিন্তু বাইরে ঝলমলে রোদ, তখন জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় জীবনযাত্রার কিছু বিশেষ দিক:
পর্দার ব্যবহার: এখানকার মানুষ ঘুমানোর জন্য ভারী এবং কালো রঙের পর্দা ব্যবহার করেন যাতে ঘর অন্ধকার রাখা যায়।
উৎসব: আইসল্যান্ড বা নরওয়েতে এই সময়ে ‘সামার সলস্টিস’ বা কর্কটসংক্রান্তি বিশাল ধুমধাম করে পালন করা হয়।
পর্যটন: এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখার জন্য প্রতি বছর লাখো পর্যটক উত্তর মেরুর দেশগুলোতে ভিড় জমান।
প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী কতটা রহস্যময়। যেখানে আমরা কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং বা মেঘলা দিনে সূর্যের অনুপস্থিতিতে অস্থির হয়ে পড়ি, সেখানে পৃথিবীর একটি প্রান্ত মাসের পর মাস সূর্যের আলোয় স্নান করছে। এই ভৌগোলিক বিস্ময় কেবল পর্যটকদের আকর্ষণই বাড়ায় না, বরং মহাবিশ্বের গাণিতিক নিখুঁত বিন্যাস নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

