যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘকালীন স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নয়, বরং আলোচনার টেবিলে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘জব্দ’ থাকা ইরানের সম্পদ। বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে থাকা এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি এখন দুই দেশের যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার প্রধান শর্ত হয়ে উঠেছে।
সম্পদ জব্দ হওয়ার প্রেক্ষাপট: ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ
ইরানের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় জ্বালানি তেলকে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন পরমাণু সমঝোতা (JCPOA) থেকে বেরিয়ে যায়, তখন তেহরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইরাকের মতো দেশগুলো ইরানের কাছ থেকে তেল কিনলেও তার মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার ভয়ে পিছিয়ে যায়।
ফলশ্রুতিতে, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ এবং তেল বিক্রির কয়েক বিলিয়ন ডলার বিদেশের ব্যাংকগুলোতে ‘ফ্রিজ’ বা স্থবির হয়ে পড়ে। ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ছিল—অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে ইরানকে নতুন কোনো কঠোর চুক্তিতে বাধ্য করা। তবে তেহরান একে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে।
কোথায় লুকিয়ে আছে এই বিপুল অর্থ?
ইরানের জব্দ করা সম্পদের মানচিত্র বেশ বিস্তৃত। বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি ব্যাংকে, যার পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ইরাকের কাছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিক্রির কয়েক বিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে ইরানের। জাপানের ব্যাংকগুলোতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানত। ইউরোপের লাক্সেমবার্গ থেকে শুরু করে ভারতের বাণিজ্যিক ব্যাংকেও ইরানের ছোট-বড় অনেক তহবিল মার্কিন আইনি মারপ্যাঁচে আটকে আছে।
এই অর্থ মূলত কোনো নগদ টাকার পাহাড় নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন ব্যবস্থায় (SWIFT) ইরানের প্রবেশাধিকার না থাকায় এগুলো ডিজিটাল লক বা তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ইরান এই টাকা দিয়ে ওষুধ বা খাদ্যের মতো মানবিক পণ্য কিনতে চাইলেও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো ব্যাংক লেনদেন করতে সাহস পাচ্ছে না।
এক নজরে ইরানের জব্দকৃত সম্পদের চালচিত্র:
দক্ষিণ কোরিয়া: প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার (যা সম্প্রতি কাতারের মধ্যস্থতায় ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে)।
ইরাক: ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি (জ্বালানি আমদানির বকেয়া বিল)।
যুক্তরাষ্ট্র: ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সম্পদ আটকে আছে।
অন্যান্য দেশ: জাপান, চীন ও ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের স্থবির ব্যালেন্স।
অর্থ মুক্তি পেলে কী পরিবর্তন আসবে?
যদি চলমান আলোচনার মাধ্যমে এই সম্পদ অবমুক্ত করা হয়, তবে ইরানের টালমাটাল অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় জোয়ার আসতে পারে। বর্তমানে ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী। এই বিলিয়ন ডলারের প্রবেশ ঘটলে তেহরান তাদের অবকাঠামো উন্নয়ন, কলকারখানা সংস্কার এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম হবে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থীদের আশঙ্কা, এই টাকা মুক্তি পেলে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোকে অর্থায়নে ব্যবহার করতে পারে। একারণেই মার্কিন প্রশাসন শর্ত দিচ্ছে যে, এই অর্থ কেবল খাদ্য, ওষুধ ও মানবিক সহায়তার কাজে ব্যয় করা যাবে।

