বিশ্বজুড়ে কি ফাটতে চলেছে ‘এআই বাবল’?



বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে হঠাৎ করেই এআই বাবল ফাটার আতঙ্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলগুলোর পেছনে টেক জায়ান্টরা যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালছে, তার বিপরীতে মুনাফার অঙ্ক এখনো বেশ হতাশাজনক। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিপুল বিদ্যুৎ খরচের কারণে মার্কিন শেয়ারবাজারে, বিশেষত নাসদাকে, শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সেগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা মোটেও সস্তা কোনো কাজ নয়। এআই চিপগুলোর কার্যক্ষমতা যত বাড়ছে, ঠিক ততটাই বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। আধুনিক এআই মডেলগুলো সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে। ডেটা সেন্টারগুলোকে ঠান্ডা রাখতে এবং সার্ভারগুলো দিনরাত সচল রাখতে গিয়ে কোম্পানিগুলোকে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল মেটাতে হচ্ছে। সম্প্রতি একাধিক বাজার বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে, এই অবকাঠামোগত ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা না গেলে কোম্পানিগুলোর মূলধন খুব দ্রুত তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে।

বড় টেক জায়ান্টগুলোর আয়ের প্রতিবেদনগুলোও এই অর্থনৈতিক শঙ্কার পালে হাওয়া দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মূলধনী ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ফ্রি ক্যাশ ফ্লো নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এই ভয়াবহ অসামঞ্জস্যতা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। অনেকেই এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন, কোটি কোটি ডলার খরচের এই ইঁদুর দৌড় আদৌ কোনো টেকসই ব্যবসায়িক মডেল কি না, নাকি এটি নিছকই একটি প্রযুক্তিগত উন্মাদনা।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই বিশাল ফারাক থেকেই মূলত এআই বাবল ফাটার কানাঘুষা শুরু হয়েছে ওয়াল স্ট্রিটে। সম্প্রতি নাসদাক সূচকে যে ভয়াবহ পতন দেখা গেছে, তা গত কয়েক মাসের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় আঘাত। এনভিডিয়া, মেটা, মাইক্রন, ব্রডকম থেকে শুরু করে এএমডির মতো স্বনামধন্য চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম এক ধাক্কায় বেশ কয়েক ধাপ নিচে নেমে গেছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন কেবল প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে অর্থ ঢালতে মোটেও রাজি নন। তারা চাইছেন দৃশ্যমান মুনাফা এবং বিনিয়োগের দ্রুত রিটার্ন।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ২০০০ সালের দিকে ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ‘ডট-কম বাবল’ ঠিক এভাবেই ফেটেছিল। সে সময়ও কোম্পানিগুলো আয়ের চেয়ে অবকাঠামো তৈরিতে বেশি মনযোগী ছিল। বর্তমান এআই উন্মাদনাও ঠিক একই পথে হাঁটছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক চলছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণ বেড়ে যাওয়া এই বাবল বা বুদবুদ ফাটার ঝুঁকি আরও বহুগুণ উসকে দিচ্ছে। অনেক স্টার্টআপ কোম্পানির ঋণের পরিমাণ তাদের বর্তমান বাজারমূল্যকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

শেয়ারবাজার মূলত মানুষের আস্থা ও আবেগের জায়গা, আর সেখানে একবার আস্থার সংকট তৈরি হলে পরিস্থিতি সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এআই স্টকের দিক থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের সন্ধান করছেন। তারা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে, একটি উন্নত ও নির্ভুল এআই মডেল তৈরি করতে আগামী দিনে বর্তমানের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কম্পিউটিং শক্তি ও অর্থের প্রয়োজন হবে। অথচ সেই অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে এই প্রযুক্তির সাবস্ক্রিপশন ফি বা অন্য কোনো মনিটাইজেশন মডেল এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

খুচরা বিনিয়োগকারীরা অবশ্য এখনো এই সাময়িক পতনের বাজার থেকে ফায়দা তোলার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। শেয়ারের দাম আগের চেয়ে কমে যাওয়ায় অনেকেই ‘ডিপ বায়িং’ বা কম দামে ভবিষ্যতের জন্য শেয়ার কিনে রাখার দিকে ঝুঁকছেন। তবে জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি হতে পারে ক্ষণস্থায়ী একটি প্রবণতা যা বড় বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে যদি টেক জায়ান্টরা তাদের খরচের খাতায় লাগাম পরাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়, তবে এই ছোট খুচরা বিনিয়োগকারীদেরও চরম অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

প্রযুক্তি বাজারের এই টালমাটাল অবস্থা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক উন্মাদনা বা হাইপ পর্ব শেষ হয়ে গেছে। এখন বাস্তবতার কঠিন মাটিতে পা রাখার এবং ব্যবসায়ের হিসাব মেলানোর সময় এসেছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের এআই উদ্যোগগুলো কেবল মিডিয়া চমক নয়, বরং তা থেকে দীর্ঘমেয়াদী আয়ের পথও সুগম হবে। এআই টুলগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজে কতটা অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই খাতের আসল সাফল্য।