ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে থাকা মধ্যপ্রাচ্যে বারুদ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী সরাতে এবার নড়েচড়ে বসেছে পাকিস্তান। ওয়াশিংটন-তেহরান যুদ্ধ বন্ধে একটি সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামাবাদ। দুই ধাপের এই পরিকল্পনায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিসহ স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পর্দার আড়ালে কূটনীতি: কী আছে এই প্রস্তাবে?
বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরেই তেহরান এবং ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষের সাথেই ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার এক অদ্ভুত ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করে আসছে পাকিস্তান। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই রয়টার্স জানিয়েছে, পাকিস্তানের প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। আন্তর্জাতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই শান্তি ফর্মুলাটি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে সাজানো হয়েছে যাতে দুই পক্ষই সম্মানজনক অবস্থানে থেকে আলোচনা শুরু করতে পারে।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপটি অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী। এতে বলা হয়েছে, কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই দুই পক্ষকে অবিলম্বে সরাসরি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হবে। এটি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যায়।
হরমুজ প্রণালি ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা
ইসলামাবাদের প্রস্তাবের দ্বিতীয় ধাপটি আরও সুদূরপ্রসারী। প্রথম ধাপের সফলতার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এই ধাপের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাণিজ্যের জন্য এই রুটটি প্রাণভোমরার মতো। পাকিস্তানের প্রস্তাবে এই প্রণালিটি দ্রুততম সময়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রাথমিক নিশ্চয়তা দেয়, তবেই এই শান্তি প্রস্তাব আলোর মুখ দেখতে পারে। পাকিস্তান এই প্রক্রিয়ায় কেবল প্রস্তাবক নয়, বরং মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী।
পাকিস্তানের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মূল দিকসমূহ:
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের এই ফর্মুলার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
তাতক্ষণিক অস্ত্রবিরতি: যেকোনো আলোচনার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে সব ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ করা।
সীমিত সময়সীমা: একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ১৫ থেকে ২০ দিনের একটি কঠোর ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমা নির্ধারণ।
জ্বালানি নিরাপত্তা: বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
বহুপাক্ষিক সংলাপ: দুই দেশের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি প্রয়োজনে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর উপস্থিতিতে একটি টেকসই শান্তি কাঠামো গঠন।
নতুন মোড়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পাকিস্তান সব সময়ই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার বৈরিতা কমাতেও অতীতে ইসলামাবাদের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তেজনা কেবল দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। পাকিস্তান খুব ভালো করেই জানে যে, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর আঁচ সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও লাগবে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার অভাব। অতীতেও অনেক আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটনের অনমনীয়তা এবং তেহরানের অনড় অবস্থানের কারণে। এখন প্রশ্ন হলো, জো বাইডেন প্রশাসন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কি ইসলামাবাদের এই দুই ধাপের ফর্মুলাকে সুযোগ দেবে?

