দীর্ঘ দেড় মাসের বিরতি কাটিয়ে আবারও বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বুধবার একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পথে একধাপ এগোল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে এই কেনাবেচা সম্পন্ন হয়েছে।
ডলারের বাজারে নতুন সমীকরণ
দেশের আর্থিক খাতের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। গত দেড় মাস ধরে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক আজ বড় অঙ্কের এই ডলার ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। সাধারণত বাজারে ডলারের সংকট থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে, কিন্তু যখন বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে বা উদ্বৃত্ত দেখা দেয়, তখন রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাজার থেকে ডলার কেনা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আজ বুধবার একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ৭ কোটি ডলার কেনা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫৬ কোটি ডলারে। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাসেই কেনা হলো এই ৭ কোটি ডলার। এর আগে দীর্ঘ সময় ডলার সংকটের কারণে রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংককে, যা বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছিল।
রিজার্ভের পালে হাওয়া: বিপিএম ৬ ও মোট মজুত
ডলার কেনার এই সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। আজ বুধবার দিন শেষে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত হিসাব পদ্ধতি বা ‘বিপিএম ৬’ (BPM6) অনুযায়ী, বর্তমানে প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ ৩০ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩১ মার্চ রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে রিজার্ভের স্বাস্থ্য বেশ খানিকটা উন্নত হয়েছে। আইএমএফের শর্তানুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ সংরক্ষণ করার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তার দিকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
একনজরে আজকের বাজারের মূল চিত্র
সংগৃহীত ডলারের পরিমাণ: ৭ কোটি মার্কিন ডলার।
বিনিময় হার: প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।
অর্থবছরের মোট ক্রয়: ৫৫৬ কোটি ডলার।
মোট রিজার্ভ (গ্রস): ৩৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।
নিট রিজার্ভ (BPM6): ৩০ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষণের আয়নায় রিজার্ভের ভবিষ্যৎ
রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের আমদানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফেরাবে। ডলারের সরবরাহ বাড়লে এলসি (LC) বা ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অনীহা দূর হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবণতার কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বাজার থেকে ডলার কিনে মজুত করার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে মুদ্রাবাজারের এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলার কেনার ফলে বাজারে স্থানীয় মুদ্রার (টাকা) সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, যা কখনো কখনো মুদ্রাস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ডলার ক্রয় ও টাকার বিনিময়ের এই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

