বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তির খবর নিয়ে এলো ওয়াশিংটন, রাশিয়ার তেল আমদানিতে ৬০ দিনের বিশেষ ছাড় পেল বাংলাদেশ। রা ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই সুযোগ আগামী ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে।
ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন ও ঢাকার কৌশলী জয়
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ এপ্রিল মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করেছে। মূলত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো যখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই বিশেষ ছাড় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর আগে গত ১২ মার্চ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সংক্রান্ত লেনদেনে প্রথম দফায় ৩০ দিনের একটি ছাড় দিয়েছিল। সেই মেয়াদ গত ১১ এপ্রিল শেষ হওয়ার পর নতুন করে আরও দুই মাসের জন্য এই সময়সীমা বাড়ানো হলো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করেই ওয়াশিংটন এই নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।
কেন রাশিয়ার তেল?
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলের দেশগুলো থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় সরকার বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়ার দিকে নজর দেয়। রাশিয়ার তেল আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতেও সহায়ক হবে।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে এই বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালনা করা সহজ ছিল না। বিশেষ করে ব্যাংকিং চ্যানেল বা সুইফট (SWIFT) সিস্টেমে জটিলতা থাকায় লেনদেনের মাধ্যম নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। মার্কিন এই ছাড়ের ফলে এখন আইনি কোনো বাধা ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রুশ জ্বালানি পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে বাংলাদেশ।
এক নজরে বিশেষ এই ছাড়ের খুঁটিনাটি:
কার্যকরী সময়: ১১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হয়ে ৯ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৬০ দিন।
পূর্ববর্তী ছাড়: ১২ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ছিল প্রথম ৩০ দিনের মেয়াদ।
আওতাভুক্ত পণ্য: রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) এবং বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য।
কারণ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা।
কূটনৈতিক গুরুত্ব: ওয়াশিংটনের সাথে ঢাকার বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ইতিবাচক প্রতিফলন।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও আগামীর সমীকরণ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৬০ দিনের এই সময়সীমা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় উইন্ডো বা সুযোগ। এই সময়ের মধ্যে সরকার যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি মজুদ করে রাখতে পারে, তবে আসন্ন মাসগুলোতে লোডশেডিং এবং শিল্পোৎপাদনের সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তবে এই ছাড় দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান নয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার কেবল একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি বহুমুখীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। রাশিয়ার এই ছাড়ের ফলে বাংলাদেশ এখন রাশিয়ার সাথে মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি চূড়ান্ত করে দ্রুত কার্গো আনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারবে।

