মধ্যপ্রাচ্যের রণদামামার মাঝেই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচলে কিছুটা গতি ফিরতে শুরু করেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের তথ্যমতে, গত বুধবার লারাক দ্বীপের রুট ব্যবহার করে ১৬টি জাহাজ এই জলপথ পার হয়েছে, যা টানা তিন দিনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে নির্দেশ করছে। তবে এই বাণিজ্যিক তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছে ইরানের সঙ্গে দেশগুলোর এক বিশেষ সমঝোতা।
সংঘাতের ছায়ায় নতুন বাণিজ্যিক কৌশল
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ যে সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি এখন ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছক। গত কয়েকদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বুধবার ১৬টি জাহাজের ট্রানজিট কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও এর পেছনের বাস্তবতা বেশ জটিল। উইন্ডওয়ার্ড জানাচ্ছে, এই ১৬টি জাহাজই ইরানের সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এবং তেহরানের দেওয়া শর্ত মেনে এই পথ ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে লারাক দ্বীপের নিকটবর্তী রুটটি ব্যবহারের প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, হরমুজ দিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে এখন ইরানের সবুজ সংকেত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আরও বেশি সংখ্যক দেশ এখন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনায় বসছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে ট্রানজিটের পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকে যাচ্ছে বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনও নগণ্য
জাহাজ চলাচলের সংখ্যা গত তিন দিনে বাড়লেও তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড)-এর পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ যাতায়াত করত। সেই তুলনায় বুধবারের ১৬টি জাহাজের পরিসংখ্যান কেবল ৮-১০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রায় সব দেশ তাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এবং নির্ধারিত ‘টোল’ প্রদানের মাধ্যমে জাহাজ চালাতে পারবে। তবে তেহরানের এই তালিকায় তাদের ঘোষিত শত্রু দেশ এবং ঘনিষ্ঠ মিত্রদের (যাদের জন্য ভিন্ন নীতি হতে পারে) ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এই বৈষম্যমূলক ট্রানজিট নীতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি: এক নজরে বর্তমান চিত্র
ট্রানজিট আপডেট: গত বুধবার ১৬টি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে, যা টানা তিন দিনের বৃদ্ধি।
রুট ও সমঝোতা: সবগুলো জাহাজই ইরানের লারাক দ্বীপের রুট ব্যবহার করেছে এবং তেহরানের সাথে সমঝোতা করে চলেছে।
বিপরীত চিত্র: যুদ্ধপূর্ব সময়ে দৈনিক গড় ১৩০টি জাহাজ চলত, যা বর্তমানে মাত্র ১৬টিতে নেমে এসেছে।
ইরানের অবস্থান: শত্রু ও নির্দিষ্ট মিত্র বাদে সব দেশের জন্য টোলের বিনিময়ে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে ইরান।
গুরুত্ব: এই রুট দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে পৌঁছায়।
জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ ও অনিশ্চয়তা
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি এশীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এই রুটে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটা মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া। ইরানের এই ‘টোল’ ব্যবস্থা এবং সমঝোতার নীতি আদতে বিশ্ব নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
তবে বাস্তবতা হলো, বিকল্প কোনো নিরাপদ রুট না থাকায় অনেক দেশই এখন ইরানের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে যদি যুদ্ধের তীব্রতা না কমে, তবে এই প্রণালিতে স্বাভাবিক ছন্দ ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতাই হতে যাচ্ছে হরমুজ পারাপারের নতুন ‘স্বাভাবিক’ নিয়ম।

