আজ আধুনিক নাটকের জনক হেনরিক ইবসেনের জন্মবার্ষিকী



আজ ২০ মার্চ; আধুনিক নাটকের জনক হেনরিক যোহান ইবসেনের জন্মবার্ষিকী।  ১৮২৮ সালের এই দিনে নরওয়ের সিয়েনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার হাত ধরেই আধুনিক বাস্তবতাবাদী নাটকের সূত্রপাত ঘটে। তাই তাকে বলা হয় আধুনিক নাটকের জনক।

ইবসেন নরওয়ের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লেখক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার হিসেবে আসীন। তিনি নরওয়ের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। ইবসেন আধুনিক মঞ্চনাটক প্রতিষ্ঠা করেছেন সামাজিক মূল্যবোধের বিভিন্ন উপাদানকে সমালোচকের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করে। ভিক্টোরীয় যুগে নাটকগুলো কেবল সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে কথা বলবে এমন ভাবা হত; যেখানে সত্য সর্বদাই কালো শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ করবে

সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবারে ইবসেনের জন্ম হয়। তার বাবা নুড ইবসেন ও মা ম্যারিচেন অ্যাটেনবার্গ। তাদের জাহাজে কাঠ পরিবহনের ব্যবসা ছিল। নরওয়ের প্রাচীন ও স্বনামধন্য পরিবারের একটি ছিল ইবসেনের পরিবার। জর্জ ব্র্যান্ডেসের কাছে লেখা এক চিঠিতে ইবসেন তার পরিবারের কথা প্রকাশ করেছেন। তার জন্মের কিছুদিন পরেই তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার বেশ অবনতি ঘটে। তার মা দুঃখ থেকে বাঁচার আশায় ধর্মে মনোনিবেশ করেন। তার বাবা বিষন্নতার শিকার হন। একারনে তার রচিত চরিত্রগুলোর মাঝে তার বাবা-মায়ের ছায়া লক্ষ্য করা যায়। আর্থিক সঙ্কটের কারনে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় তার নাটকের একটি প্রধান ভাব। এছাড়া মানুষের গোপন ঘটনার কারনে দ্বন্দ্ব্বও তার রচনার আরেকটি প্রধান বিষয়।

পনের বছর বয়সে ইবসেন ঘর ছাড়েন।  ফার্মাসিস্ট হওয়ার জন্য তিনি একটি শহরে আসেন এবং এখানেই তার নাটক লেখার সূত্রপাত হয়।  ইবসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উদ্দেশ্যে তৎকালীন বর্তমান অসলো যান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চিন্তা বাদ দিয়ে (তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রাথমিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, কেননা তিনি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি) নাটক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তার প্রথম উপন্যাস ketilina একটি বিয়োগান্তক উপন্যাস, যা তিনি Brynjulf Bjarme ছদ্মনামে প্রকাশ করেন।

বার্গেনের একটি নরওয়েজীয় নাট্যগোষ্ঠীতে তিনি পরবর্তী কয়েক বছর চাকরি করেন। এখানে তিনি ১৪৫টিরও বেশি নাটকে নাট্যকার, পরিচালক এবং প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময়ে তিনি তার নতুন কোন নাটক প্রকাশ করেননি। নাট্যকার হিসবে সাফল্য লাভে ব্যর্থ হলেও এই গোষ্ঠীতে তিনি অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছেন যা পরবর্তীকালে তার লেখার কাজে এসেছে।

ইবসেন ১৮৫৮ সালে ক্রিস্টিয়ানিয়াতে আসেন এবং ক্রিস্টিয়ানিয়ার জাতীয় থিয়েটারের সৃজন পরিচালক নিযুক্ত হন। তিনি সুজানা থোরেনসেন নামীয় ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করেন, যার গর্ভে তার একমাত্র সন্তান সিগার্ড ইবসেন জন্ম নেয়। এই দম্পতি খুবই অর্থকষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করেছেন এবং নরওয়ের জীবন নিয়ে ইবসেন খুব হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। ১৮৬৪ সালে তিনি ক্রিস্টানিয়া ত্যাগ স্বেচ্ছা নির্বাসনে ইতালি চলে যান। তিনি এর পরের ২৭ বছর আর স্বদেশে ফিরে আসেননি। যখন ২৭ বছর পর তিনি দেশে ফিরেন, ততদিনে তিনি নাট্যকার হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করেছেন।

সাফল্যের সাথে সাথে ইবসেনের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তিনি নাটকে তার বিশ্বাস, বিচার ও চেতনার প্রকাশ ঘটাতে শুরু করেন। এই ধরনের নাটককে তিনি নাম দিয়েছেন “drama of ideas”। তার পরবর্তী নাটকের সিরিজকে ইবসেন নাটকের স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে, যেখানে তার ক্ষমতা, সৃজনীশক্তি ও প্রভাবের পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। এই ধরনের নাটক তখন ইউরোপে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ১৮৮২ সালে তিনি প্রকাশ করেন অ্যান এনিমি অফ দ্যা পিপল। আগের নাটকগুলোতে বিতর্কিত বিষয়াদি গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও তা ব্যক্তিগত অঙ্গনের ভিতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। অ্যান এনিমি ইফ দ্য পিপল নাটকে বিতর্কই প্রধান আলোচ্য বিষয় এবং পুরো সমাজই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী। যে প্রধান বার্তা এই নাটকটির মাধ্যমে দেয়া হয়েছে তা হল, কখনো কখনো একজন ব্যক্তির মতই সঠিক হতে পারে যদিও সাধারণ জনতা সকলেই ভিন্ন মত পোষন করে। সাধারণ জনতাকে এখানে মূর্খ ও ভেড়ার পালের মত তুলনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চলিত ভিক্টোরিয়ান বিশ্বাস, সমাজ একটি মহৎ প্রতিষ্ঠান এবং সর্বদা বিশ্বাসযোগ্য এই ধারণাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তার বিখ্যাত সাহিত্য কর্মের মধ্যে দ্যা বুরিয়াল মণ্ড, সেন্ট জন্স ইভ,লাভস কমেডি,ব্রান্ড,পিয়ার গিন্ত, দ্যা লিগ অফ ইয়ুথ, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

তার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ  Terje Vigen

২৩ মে ১৯০৬ এই মহান নাট্যকার মৃত্যুবরণ করেন।