আজ এক জাতির পিতা জন্মেছিলেন



স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯২০ সালের আজকের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জাতীয় শিশু দিবস হিসেবেও পালিত হবে দিনটি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালে তত্কালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের টিকিটে ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আজীবন সোচ্চার এ অবিসংবাদিত নেতাকে রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণ করতে হয়।

তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ও পরবর্তী সময়ে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ করেন।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হলো পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। মুজিব একে আখ্যা দিলেন ছয় দফার পক্ষে গণভোট বলে। নির্বাচনে তাঁর দল পেল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কিন্তু কুচক্রীরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় না, চায় না ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচনা। বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন অসহযোগ আন্দোলনের। এই আন্দোলনের সাফল্য সারা বিশ্বকে চমকিত করল। সাতই মার্চ রমনার রেসকোর্সে লাখ লাখ মানুষের সামনে ভাষণ দিলেন মুজিব। এটাই ছিল তাঁর জীবনের সেরা মুহূর্ত। তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ তিনি বললেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ্।’ তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই মৌখিক ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্গত। এ ভাষণ শুনে আজও শিহরিত হতে হয়।

পাকিস্তানি বাহিনী নির্মম গণহত্যার সূচনা করে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধুকে। তার আগে তিনটি সম্প্রচার যন্ত্র থেকে প্রচারিত হয় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা-ঘোষণার দুটি ইংরেজি ভাষ্য। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত, কিন্তু সে-যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল তাঁরই নামে। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালিরা প্রথমে প্রতিরোধ ও পরে পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা করে এবং শেষ পর্যন্ত নিতান্ত অল্প সময়েই ভারতের সাহায্যে বিজয় অর্জন করে। মুজিবের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক চাপ আর পাকিস্তান উপেক্ষা করতে পারে না। তিনি ফিরে আসেন স্বদেশবাসীর মধ্যে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন এবং বাস্তুচ্যুত ও অসহায় মানুষের পুনর্বাসনের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করলেন। এক বছরের মধ্যেই জাতি একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান পেল, অনুষ্ঠিত হলো সাধারণ নির্বাচন। কিন্তু সময়টা অনেক বদলে গিয়েছিল। স্বাধীন দেশে মানুষের প্রত্যাশা এত বেড়ে গিয়েছিল যে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তার মিল হচ্ছিল না। অস্ত্রশস্ত্র সারা দেশে ছড়িয়ে গিয়ে এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করে। অতি বাম এবং বাংলাদেশবিরোধী দক্ষিণপন্থীদের সশস্ত্র হানা এই অরাজকতাকে বাড়িয়ে দেয়। বৈরী আবহাওয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের ফলে দেশে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষাবস্থা।

সংবিধান সংশোধন করে বঙ্গবন্ধু প্রবর্তন করলেন প্রকৃতপক্ষে একদলীয় শাসনব্যবস্থা। গণতন্ত্রের জন্য—বিশেষত সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য—তাঁর জীবনব্যাপী সংগ্রামের সঙ্গে এই পদক্ষেপ সংগতিপূর্ণ ছিল না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এটি সাময়িক ব্যবস্থা। হয়তো তাই। কিন্তু নতুন অবস্থার পরিণাম দেখার সুযোগ আমাদের হয়নি। তার আগেই দেশদ্রোহী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হয়। তাঁর রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রাস্তায় তাঁর বাড়ির সিঁড়িতে। পরদিন হেলিকপ্টারে করে তাঁর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায়। প্রথমে বিনা জানাজায় তাঁকে সমাধিস্থ করার চেষ্টা হয়। সে-প্রয়াস ব্যর্থ হলে কাপড়-কাচা-সাবান দিয়ে তাঁর মরদেহ ধোয়ানো হয়। কাফনের জন্য উপযুক্ত কাপড়েরও ব্যবস্থা করা যায়নি। যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সেখানেই তিনি আছেন।

দিবসটি উপলক্ষে সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা আয়োজন করছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

দিবসটি উদযাপনের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত মুজিব বর্ষ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।