ধর্ষকের বিরুদ্ধে লড়াকু এক মা; নকুবঙ্গা কাম্পি



দিনে গড়ে ১১০টির মতো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকায়। ধর্ষণকে দেশটিতে বর্ননা করা হয় জাতীয় সংকট হিসেবে। এমনই দেশের নাগরিক নকুবঙ্গা কাম্পির গল্পটা ভিন্ন। তার মেয়ের ধর্ষকদের একজনকে হত্যা এবং বাকি দুইজনকে আহত করার ঘটনায়  ‘সিংহ মা’ যার স্থানীয় অর্থ (লায়ন মামা) হিসেবে দক্ষিন-আফ্রিকায় পরিচিত হয়ে উঠছেন।

এ ঘটনায় তাকে অভিযুক্ত করে তার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ এনেছিল আদালত। কিন্তু, জনগণের প্রতিবাদের কারণে তার বিচার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

এর ফলে তিনি তার অসুস্থ মেয়ের পাশে থাকার সময় পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তার মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া সেদিনের সেই ঘটনা তিনি বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন।

নকুবঙ্গা জানান, সিফোকাজি কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা করতে ওই গ্রামেরই আরেকটি বাড়িতে গিয়েছিলেন। তিনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তার বন্ধুরা তাকে একা রেখে বাড়ির বাইরে চলে যায়। রাত দেড়টার দিকে আশেপাশের আরেকটি বাড়ি থেকে তিনজন মাতাল পুরুষ এসে তাকে আক্রমণ করে।

মধ্যরাতে তার কাছে একটি ফোন আসে, ফোনের ওপাশে ছিলেন তার মেয়ে সিফোকাজি। সেসময়  সিফোকাজি তার মাকে জানালেন যে তিনজন পুরুষ তাকে ধর্ষণ করেছে এবং তাদেরকে তারা সবাই ভালো করেই চেনে।

এ কথা শোনার পর,  নকুবঙ্গা প্রথমেই তার মেয়েকে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। কিন্তু ওপাশ থেকে তিনি কোন সাড়া পেলেন না।

সিফোকাজি ভেবেছিলেন এই সময় সাহায্যের জন্যে  তার মা-ই একমাত্র আছেন, যিনি এগিয়ে যেতে পারেন।

কিন্তু,  নকুবঙ্গা জানতেন পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেইপ প্রদেশের প্রত্যন্ত এই গ্রামটিতে আসতে তাদের অনেক সময় লাগবে।

নকুবঙ্গা জানান যে,  আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি যেতে বাধ্য হলাম কারণ সে তো আমারই মেয়ে।  আমি ভাবছিলাম যখন আমি পৌঁছাবো তখন হয়তো দেখবো সে মরে পড়ে আছে। কারণ সে তো ধর্ষণকারীদের চিনতো। ওই লোকগুলো যেহেতু তাকে চেনে, সে কারণে ওরা নিশ্চয়ই আমার মেয়েকে মেরে ফেলবে – যাতে সে ধর্ষণের ব্যাপারে পুলিশের কাছে কোন অভিযোগ করতে না পারে।

নকুবঙ্গা বলেন,  তার মেয়ের এই খবর পেয়ে ঘুম থেকে ওঠে তিনি কিচেনে গিয়ে সেখান থেকে একটি ছুরি হাতে নেন। ছুরিটা আমি নিয়েছিলাম আমার নিজের জন্য। রাতের অন্ধকারে যখন রাস্তা দিয়ে ওই বাড়িতে হেটে  যাবো, ভেবেছিলাম ওটা আমার জন্যে নিরাপদ হবে না। খুব অন্ধকার ছিল বাইরে। মোবাইল থেকে টর্চের আলো জ্বালিয়ে পথ দেখে দেখে আমাকে যেতে হয়েছিল।

তিনি যখন ওই বাড়ির কাছাকাছি গেলেন তখন তিনি মেয়ের চিৎকার শুনতে পান। বাড়িটির বেডরুমে ঢোকার পর মোবাইল ফোনের টর্চের আলোতে তিনি দেখলেন – তার মেয়েকে ধর্ষণ করা হচ্ছে।  খুব ভয় পেয়ে যাই,  কোন রকমে দরজার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম তারা ওখানে কী করছে। আমাকে দেখে তারা আমার উপর আক্রমণ চালাতে ছুটে এলো। ঠিক ওই মুহূর্তে আমার নিজেকে বাঁচানোর কথা মনে হয়েছিল।

তিনি বলেছেন যে তিনজন পুরুষের একজন তার মেয়েকে ধর্ষণ করছিল, আর দু’জন প্যান্ট খোলা অবস্থায় পাশেই দাঁড়িয়েছিল। তারা অপেক্ষা করছিল তাদের পালা কখন আবার আসবে।

এই মামলায় বিচারক আদালতে বলেছিলেন, নকুবঙ্গার সাক্ষ্য থেকে বোঝা যায় যে তিনি কতোটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি যে খুব ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন সেটা বোঝা যায়। কারণ তিনি দেখতে পেলেন তার মেয়েকে চোখের সামনে ধর্ষণ করা হচ্ছে।

পুরুষরা যখন নকুবঙ্গাকে আক্রমণ করে তখন তিনিও তার ছুরি দিয়ে পাল্টা আঘাত করেছিলেন। যখন তারা পালাতে উদ্যত হয় তখন তিনি ছুরি মারেন। তাদের একজন জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ধর্ষণকারীদের দু’জন গুরুতর আহত হয় এবং অন্যজন মারা যায়।

ওই লোকগুলো কতোটা আহত হয়েছিল নকুবঙ্গা সেটা দেখার জন্য ওই বাড়িতে আর অবস্থান করেন নি। বরং তার মেয়েকে নিয়ে চলে যান কাছেই এক বন্ধুর বাড়িতে।

পুলিশ এসে যখন নকুবঙ্গাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো স্থানীয় একটি পুলিশ স্টেশনে। সেখানে একটি সেলে তাকে বন্দী করে রাখা হলো।

পরবর্তীতে নকুবঙ্গার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করলো দক্ষিণ আফ্রিকার লোকজন। তার আইনি লড়াই-এ সহযোগিতা করতে তারা অর্থ সংগ্রহেও নেমে পড়ে। তার পর থেকে ধীরে ধীরে তার প্রতি জনগণের সমর্থন বাড়তেই লাগলো। মানসিকভাবেও তিনি কিছুটা শক্তি পেতে শুরু করলেন।

ঘটনার এক মাস পর তিনি উপস্থিত হলেন স্থানীয় একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। “আদালতে যাওয়ার ব্যাপারে আমি ভয়ে ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে আমি প্রার্থনা করলাম।”

তিনি যখন আদালতে গিয়ে হাজির হলেন – দেখলেন, সেখানে তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আরো বহু মানুষ ইতোমধ্যেই সেখানে জড়ো হয়েছেন। তখন তাকে খুব দ্রুত আদালতের সামনে হাজির করা হলো এবং বলা হলো যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নকুবঙ্গা বলেন,”আমি শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম। খুব খুশি হয়েছিলাম তখন। তখন বুঝলাম যে কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক বিচার ব্যবস্থা সেটা নির্ধারণ করতে পারে। তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে কারো জীবন কেড়ে নেওয়া আমার লক্ষ্য ছিল না।”