জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে চলমান বিতর্ক ও অস্পষ্টতার অবসান ঘটিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার (৩০ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি বৈঠকে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওই সময়ে যা ঘটেছে তা ‘যুদ্ধের ময়দানেই ফয়সালা হয়ে গেছে’। রাজনৈতিক মহলে বহুল আলোচিত ‘পুলিশ হত্যা’র ফ্রেম ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার বিরুদ্ধে এটি সরকারের পক্ষ থেকে এক কঠোর ও নজিরবিহীন অবস্থান বলে মনে করা হচ্ছে।
সংসদ সদস্যের প্রশ্ন ও উদ্ভূত পরিস্থিতি
বিকেলে সংসদীয় কার্যক্রম চলাকালে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন চালিয়েছিল, তা নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চললেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কোনো বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না।
আখতার হোসেন আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ‘পুলিশ হত্যা’ নামক একটি নির্দিষ্ট বয়ান (ন্যারেটিভ) তৈরি করা হচ্ছে, যা পুলিশ বাহিনীর ভেতরে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। যারা ঘাতক ছিল, তাদের শাস্তির বিষয়ে যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ জানতে চান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলো ছিল একটি গণঅভ্যুত্থান এবং জনগণের সঙ্গে স্বৈরাচারের রক্ষীবাহিনীর সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যখন রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়, তখন প্রথাগত আইনি কাঠামোর চেয়ে ইতিহাসের বিচার বড় হয়ে দাঁড়ায়।
মন্ত্রী বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে যা কিছু ঘটেছে, বিশেষ করে পুলিশের ভূমিকা এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া—সেটা মূলত যুদ্ধের ময়দানেই ফয়সালা হয়ে গেছে।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জনগণের ওপর গুলি চালানো এবং তার বিপরীতে সৃষ্ট গণরোষ একটি যুদ্ধাবস্থার সমতুল্য ছিল, যার মীমাংসা রাজপথেই হয়ে গেছে।
পুলিশ বাহিনীর শুদ্ধি অভিযান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাইয়ের ঘটনার পর থেকে পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব করার লক্ষ্যে বড় ধরনের সংস্কার কাজ চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধিবেশনে স্পষ্ট করেন যে, যারা সরাসরি অপরাধে জড়িত ছিল এবং সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান। তবে ‘পুলিশ হত্যা’র দোহাই দিয়ে বাহিনীকে অস্থিতিশীল করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মন্ত্রীর এই মন্তব্য বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা করতে এবং যারা অপরাধের দায় এড়াতে পাল্টা অভিযোগ তুলছে, তাদের মুখ বন্ধ করতে সহায়ক হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্য কেবল একটি আইনি ব্যাখ্যা নয়, বরং এটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের একটি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ‘ফয়সালা’র ঘোষণা পুলিশ বাহিনীর ভেতরে থাকা দোলাচল দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে।

