ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল: আলোকবর্তিকা হাতে মহিয়সী




ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেয়া সত্ত্বেও তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছেন মানব সেবায়। গোটা বিশ্বকে শিখিয়েছেন সেই অমোঘ বাণী ‘সেবাই প্রকৃত ধর্ম’। আজকের রেডক্রসসহ অনেক সেবা সংগঠনের অনুপ্রেরণার উৎস এই মহিয়সী। তিনি ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।
‘Lady with the Lamp’, অর্থাৎ আলকবর্তিকা হাতে নারী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আহত সৈনিকরা এ নামেই ডাকতেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে। কারণ রাতের বেলা তিনি আলো হাতে সৈনিকদের সেবা করতেন, খোজ নিতেন। আজ থেকে কত বছর আগে উনি শিখিয়ে গিয়েছেন আধুনিক নার্সিং আর আহতের সেবা।

অভিজাত ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্রিটিশ পরিবারে ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ফ্লোরেন্স শহরের নামানুসারেই মা-বাবা তার এই নাম রাখেন। তার বড় বোনেরও জন্ম হয়েছিল ইতালিতেই। নাইটিঙ্গেল দম্পতি বিয়ে পরবর্তী দুই বছরের জন্য ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ফ্লোরেন্সের জন্মের এক বছর পরই তার বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল সপরিবারে ফিরে আসেন ইংল্যান্ডে। তারা বসবাস করতে থাকেন ডার্বিশায়ারে। তার মা ছিলেন ম্যারি নি।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন অনেক মেয়েই শিক্ষা কী তা বুঝত না। সেক্ষেত্রে ফ্লোরেন্সের ভাগ্য ছিল খুবই ভালো- তার বাবা উইলিয়াম বিশ্বাস করতেন, মেয়েদেরও শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত। তিনি ফ্লোরেন্স ও তার বোনকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। মেয়েদের পড়িয়েছেন বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস ও দর্শন।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন অনেক মেয়েই শিক্ষা কী তা বুঝত না। সেক্ষেত্রে ফ্লোরেন্সের ভাগ্য ছিল খুবই ভালো- তার বাবা উইলিয়াম বিশ্বাস করতেন, মেয়েদেরও শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত। তিনি ফ্লোরেন্স ও তার বোনকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। মেয়েদের পড়িয়েছেন বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস ও দর্শন।
ছোটবেলা থেকেই কেউ অসুস্থ হলে ফ্লোরেন্স সেখানে সেবা করতে ছুটে যেতেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি ডার্বিশায়ার থেকে লন্ডনে আসেন। সে সময় লন্ডনের হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল খুবই করুণ। এর অন্যতম কারণ সে সময়ে কেউ সেবিকার কাজে এগিয়ে আসতেন না। এ পেশাকে তখন খুব ছোট করে দেখা হতো। অথচ তিনি জীবনের সেরা এমনকি সবটুকু সময় ব্যয় করেছেন মানুষের সেবায়। প্রবল তুষারপাত ও বৃষ্টির মধ্যেও তিনি হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
মাত্র ১৭ বছর বয়সেই নাইটিঙ্গেল বিশ্বাস করতেন স্রষ্টা তাকে সেবিকা হওয়ার জন্যই পাঠিয়েছেন। এ কাজে আগ্রহ প্রকাশ করলে মা-বাবা রাজি হননি এই ভেবে, একজন শিক্ষিত মেয়ে হিসেবে তার যে কোনো ভালো পেশায় যাওয়া উচিত। কিন্তু আশা ছাড়েননি ফ্লোরেন্স। অবশেষে বাবা-মায়ের অনুমতি মিললে তিনি ১৮৫১ সালে নার্সের প্রশিক্ষণ নিতে উড়াল দেন জার্মানিতে। ১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৯ সালে তিনি নাইটিঙ্গেল ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৮৫৯ সালে রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং। ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ’।
১৮৮৩ সালে রানী ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদকে ভূষিত করেন। প্রথম নারী হিসেবে ‘অর্ডার অব মেরিট’ খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি। ক্রিমীয় যুদ্ধের সময় আহত সৈন্যদের সেবার মাধ্যমে নার্সিংকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আর এ কারণেই তাকে ডাকা হতো ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’। যুদ্ধের পর তিনি বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নারীমুক্তির জন্যও পূর্ণমাত্রায় সোচ্চার ছিলেন। নাইটিঙ্গেলের বিশ্বাস ছিল, মানবসেবার এমন কাজে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য ঈশ্বরের কাছ থেকে তার ডাক এসেছে। এক্ষেত্রে মা ও বোনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। বহু মনীষী তাকে ঈশ্বরের দূত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এখন যারা এ পেশায় নতুন আসেন তারা ‘নাইটিঙ্গেল প্লেজ’ নামে একটি শপথ গ্রহণ করে তার প্রতি সম্মান জানান। ১৯৭৪ সাল থেকে তার জন্মদিন ১২ মে পালিত হয়ে আসছে ‘ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে’।
ইস্তাম্বুলে তার নামে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। লন্ডনের ওয়াটারলু ও ডার্বিতে রয়েছে তার প্রতিকৃতি। লন্ডনের সেন্ট থোমাস হসপিটালে রয়েছে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মিউজিয়াম। ব্রিটিশ লাইব্রেরি সাউন্ড আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে তার কণ্ঠস্বর, যেখানে তিনি বলেছেন- যখন আমি থাকব না, সেই সময় আমার এই কণ্ঠস্বর আমার মহান কীর্তিগুলোকে মানুষের কাছে মনে করিয়ে দেবে এবং এসব কাজের জন্য উৎসাহ জোগাবে। দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প নামে একটি নাটক মঞ্চায়িত হয় ১৯২৯ সালে- যার নামভূমিকায় অভিনয় করেন এডিথ ইভানস। তার জীবনী নিয়ে চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯১২, ১৯১৫, ১৯৩৬ ও ১৯৫১ সালে।
১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট অর্থাৎ আজকের এই দিনে ৯০ বছর বয়সে এই মহীয়সী নারী চলে যান পৃথিবী ছেড়ে প্রশান্তি নিয়ে। মৃত্যুর সময় তিনি নিজ বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারে সেন্ট মার্গারেট চার্চে তাকে সমাহিত করা হয়।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তার কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, নার্সিং একটি পেশা নয়- সেবা। যুদ্ধাহতদের সেবায় জীবনকে ঝুঁকিতে রাখা এ নারীর কথা আজীবন মনে রাখবে পৃথিবীর মানুষ। অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও বিলাস ও আরাম ছেড়ে তিনি আর্তের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন সারাটি জীবন।