বার্সেলোনা : ক্লাব নয়, অদ্ভুত সুন্দর শহর



আয়েশা সিদ্দিকা

বার্সেলোনা!

সাধারণ জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে এই নামে যে একটা শহর আছে সেটাই জানতাম না। ফুটবল খেলার একটা বিখ্যাত ক্লাবের নাম হিসেবেই চিনতাম বার্সেলোনাকে।

এরপর আমার বিয়েতে অতিথি হিসেবে আসলো দুই বার্সেলোনাবাসী। তাদের কাছ থেকেই মূলত জেনেছি বার্সেলোনা একটা শহরের নাম।

মেইল চেক করায় আমি বরাবরই অলস। সেইবার মেইল চেক করে প্লেনের টিকেট দেখে খুবই সারপ্রাইজড হয়েছিলাম। আড়াই ঘন্টা জার্নি শেষে বার্সেলোনা এয়ারপোর্টে নামলাম।

ছিমছাম আর বেশ বড় এয়ারপোর্ট, সেই তুলনায় ভীড়বাট্টা কম। তিন দিনের ট্রান্সপোর্ট টিকেট অনলাইনে কেটে রাখা ছিল। এয়ারপোর্টে কাস্টমার সার্ভিসের লাইনে প্রায় ১৫ মিনিট দাঁড়ানোর পরে জানলাম টিকেট প্রিন্ট করতে ১ ইউরো লাগবে যেটা মেট্রো স্টেশনে ফ্রি।

২০ ইউরোর টিকেট কেটে প্রিন্ট করব আবার ১ ইউরো দিয়ে!

হুহ, কখনওই না। মেট্রো স্টেশনে গিয়ে টিকেট প্রিন্ট করে ট্রেন ধরলাম শহরের উদ্দেশ্যে। ইউরোপের এখন পর্যন্ত স্পেনে গিয়েই কিছুটা দেশী ফ্লেভার পেয়েছি।

স্প্যানিশদের গাত্রবর্ণ আর চুলের জন্যই হয়ত এইরকম মনে হয়েছে। আবার ট্রেনের জানালা দিয়ে আসেপাশের সুউচ্চ বিল্ডিং আর তাদের ব্যালকনিতে টানটান করে ঝুলানো কাপড়ের রাশি দেখে বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে অদ্ভুত ভাললাগা কাজ করেছিল।

নিরাপদে গুগল ম্যাপের সাহায্যে ট্রেন এবং মেট্রোতে চড়ে Airbnb তে পৌছালাম। হোস্ট হিসেবে স্প্যানিশরা বেশ ভাল সেটা বলতেই হবে। আমরা ছিলাম সারগাঁদা ফ্যামিলিয়াতে, যেখান থেকে যেকোন ট্যুরিস্ট স্পটের বাস কিংবা মেট্রোর কানেকশন ভাল আর সময়ও কম লাগে।

যদিও আমরা নতুন জায়গায় গেলে হেঁটে ঘুরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

আমি পৌছানোর প্রায় ঘন্টা দুয়েক পরে স্বামী মশাইয়ের আগমণ। যেহেতু রাত হয়ে গিয়েছিল তাই আসেপাশে কিছুক্ষণ হেটে রাতের ডিনার সেরে বাসায় চলে আসি। পরের দিন সকাল থেকে শুরু হয় আমাদের শহর ভ্রমণ।

রৌদ্রজ্জ্বল চমৎকার আবহাওয়া আর প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর অতুলনীয় একটি শহর, বার্সেলোনা।

স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং কাতালানের রাজধানী। এখানকার নামকরা একজন আর্কিটেকচার আন্তোনি গাউদি। বার্সেলোনাতে বিখ্যাত তিনটি বিল্ডিং এর (ট্যুরিস্ট স্পট) ডিজাইন তার করা। এর মধ্যে একটি সারগাঁদা ফ্যামিলিয়া ব্যাসিলিকা যেটা আমাদের থাকার জায়গার পাশেই, বাকিগুলি হচ্ছে ক্যাসে মিয়া আর ক্যাসে বাতিয়ো।

অসাধারণ শিল্প নৈপূণ্যে ভরপুর এই ভবনগুলির দেখার সাথে গুটিগুটি পায়ে র্যাস ল্যামবাস এর গাছের ছায়ায় মোড়ানো রাস্তায় হেটে পুরো শহর চষে বেড়ালাম দুইজন। ততক্ষণে বেশ জাকিয়ে ক্ষুধা লেগেছে দুইজনেরই। লায়া আর জর্জের ( স্প্যানিশ ফ্রেন্ড) সাজেশনে একটা

রেস্টুরেন্টে গিয়ে গেলাম লাঞ্চ করতে। নতুন কোন জায়গায় গেলে আমরা অলওয়েজ প্রেফার করি অন্তত একবেলা হলেও লোকাল খাবার ট্রাই করতে। আর সিফুডের প্রতি আমি বরাবরই দুর্বল।

স্প্যানিশ ফুড আমাকে হতাশ করেনি। প্রাইস রিজনেবল হওয়ার কারণে যে কয়দিন ছিলাম সে কয়দিনই পইয়া খেয়েছি।

ভাতের সাথে সিফুডের মিশ্রণ, বলতে গেলে সব ধরণের মশলা দিয়ে মাছ ভাত একসাথে রান্নার মত। পেটপুজো সেরে ফুরফুরে মুডে এগেইন ঘুরাঘুরি।

ওয়াকিং স্ট্রিট ধরে হেটে এরপর গেলাম সিটি সেন্টার-এ (Palace de Catalunya)। পুরো গ্রাউন্ড জুড়ে হাজার হাজার কবুতর। মন আর চোখ দুটোই ভরে গেছে কবুতর দেখে।

আসেপাশে ভ্রাম্যমাণ কিছু স্টোর ছিল যেটাতে গম পাওয়া যায় কবুতরদের খাওয়ানোর জন্য। এক প্যাকেট গম কিনে ছড়িয়ে দিতেই ঝাকে ঝাকে কবুতর উড়ে এল আমার দিকে। বাংলাদেশ থেকে আসার পরে এতটা আনন্দ কবে পেয়েছিলাম সেটা আমার মনে পড়ছে না।

বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে পোজ দিয়ে ছবি তুল্লাম। পরে খেয়াল করলাম হুটোপুটি করে হাতে বসে গম খাওয়ার পাশাপাশি এদের পায়ের নখের আঁচড়ে আমার হাত ক্ষতবিক্ষত।

যদিও তখন আনন্দের আতিশয্যে টেরই পাইনি। এরপর বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবের অফিশিয়াল স্টোরে গিয়ে জার্সি আর মাফলারের দাম দেখে হতাশ হয়ে কয়েকটা তুলে বের হয়ে এলাম। ছবি না তুললে যে পাপ হবে।

বার্সেলোনা ট্যুর ছিল আমাদের এ যাবতকালের সবচেয়ে বেশি রিল্যাক্সিং ট্যুর। পরের দিন বেশ বেলা করেই বাসা থেকে বের হলাম। এগেইন স্প্যানিশ ডিশ দিয়ে লাঞ্চ করে বিখ্যাত বার্সেলোনা বিচে গেলাম।

বিচ থেকে বাসে করে গেলাম ক্যাম্প ন্যু তে। ক্যাম্প ন্যু ঘুরে আরো কিছুক্ষণ হেটে বাসায় ফিরে আমাদের এইবারের যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটালাম।