বিশ্বকাপের বিশেষ গল্প ব্রাজেন্টিনা



সাকিব আহমেদ
‘মেসি এবার ঠিকই জিতবে দেখিস!’ হঠাৎ করেই বলে উঠল অভ্র। অভ্রর কথা শুনে বাঁকা চোখে তাকালো নাজিয়া।
নাজিয়ার ফুটবলে বরাবর কোনো আগ্রহ নেই। তারপরও অভ্রর কল্যাণে মোটামুটি ফুটবলের দলগুলোর নাম, খেলোয়াড়দের নাম মুখস্থ হয়ে গেছে। অভ্র রাত জেগে খেলা দেখে আর পরের দিন পুরো খেলার রিভিউ দেয় নাজিয়াকে। মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হয় নাজিয়া। কিন্তু অভ্র যে শুনবার পাত্র নয়, তাই কিছু বলে না। একেবারেই কিছু যে বলে না তা অবশ্য নয়।
‘তোর এই খেলার প্যাঁচাল থামাবি?’ বিরক্তি কন্ঠে বলল নাজিয়া।
‘থামালে হবে কি করে? বিশ্বকাপ আসছে, এখন তো এ নিয়েই আলোচনা হবে।’ জবাব দিল অভ্র।
অভ্র আর নাজিয়া ভার্সিটির বন্ধু। যাকে বলে একেবারে বেস্ট ফ্রেন্ড। শুধু বন্ধু বললেও কম বলা হয়, দু’জন দু’জনকে পছন্দও করে। যদিও কেউ তা প্রকাশ করার সাহস করে না। ভার্সিটির সিনিয়র জুনিয়র অবশ্য ধারণা করেই নিয়েছে, তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের থেকেও বেশি কিছু আছে।
সে নিয়ে দুজনের কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। মানুষের ভাবনা নিয়ে চিন্তা করার সময়, ইচ্ছে কোনোটাই তাদের নেই।
‘তাহলে তুই খেলা নিয়েই পরে থাক। আমি চললাম।’ অভ্রর কথার জবাবে বলল নাজিয়া। উঠে চলে যাচ্ছিল। হাত ধরে টেনে নাজিয়াকে আবার জায়গায় বসিয়ে দিল অভ্র। ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়াতে বসে আছে ওরা। আগামীকাল একটা পরীক্ষা আছে। সেই নিয়েই গ্রূপস্টাডি করছিল। এমন সময় কেউ খেলার কথা চিন্তা করে? অন্যদিকে মুখ ঘোরালো নাজিয়া।
এমন সময় ‘অভ্র অভ্র’ ডাক শোনা গেল। কে এভাবে চিৎকার করে ডাকছে? দীপককে দেখা গেল এখানেই দৌড়ে আসছে, চিৎকার করে ডাকছে অভ্রকে। দীপক ওদের ভার্সিটির আরেক বন্ধু। এভাবে দৌড়ে আসছে কেন ও? কোনো সমস্যা হলো না তো? দুইজনই উঠে দাঁড়িয়েছে।
দীপক এসে ওদের সামনে দাঁড়ালো। অভ্রর দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘তুই এখানে? আমি সারা ভার্সিটি তোকে খুঁজছি। ফোন বন্ধ কেন তোর?
‘আরেহ, ফোন তো ভুলে বাসায় ফেলে এসেছি।’ জবাব দিল অভ্র। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু কি হয়েছে? কোনো সমস্যা হয়েছে? এভাবে হাপাচ্ছিস যে?’
দীপক হাঁপাচ্ছে দেখে নাজিয়া ওর ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে দিল। ‘আগে তুই বস,’ বলল নাজিয়া। ‘পানি খেয়ে একটু জিরিয়ে নে। যেভাবে হাপাচ্ছিস।’
‘ধন্যবাদ।’ দুই ঢোক পানি খেয়ে বোতলটা ফিরিয়ে দিল নাজিয়ার হাতে।
‘এবার বল কি হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল অভ্র।
‘তুই শুনিসনি?’
‘কোন ব্যাপারে?’
‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভার্সিটিতে যে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছে।’
‘তাই নাকি?’ চোখটা চকচক করে উঠল অভ্রর। ফুটবল খেলায় ভার্সিটির সেরা খেলোয়াড় অভ্র। তার ধারে কাছে কেউ নাই। ডিপার্টমেন্টভিত্তিক এক টুর্নামেন্টে কিছুদিন আগে নিজের ডিপার্টমেন্টকে চ্যাম্পিয়ন করেছে অভ্র। ‘কবে খেলা?’ জিজ্ঞেস করল অভ্র।
‘আগামী শুক্রবার।’ জবাব দিল দীপক। ‘কাল ট্রায়াল। যারা যারা খেলতে ইচ্ছুক কাল দুপুর তিনটায় ভার্সিটির মাঠে দেখা করতে বলেছে ইলিয়াস স্যার। সেখানে বাছাই হবে।’ এই বলে থামল দীপক। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘তুই খেলবি তো?’
‘অবশ্যই,’ অভ্রর জবাব। ‘আর্জেন্টিনার জন্য খেলব না, তা কি করে হয়?’
‘তাহলে সময় মত চলে আসিস।’ বলে উঠে দাঁড়ালো দীপক। ‘আমি এখন যাই। কাল মাঠে দেখা হবে।’ দীপকও আর্জেন্টিনার সমর্থক। গোলকিপার হিসেবে ভালোই খেলে। ট্রায়ালে ওই সুযোগ পাবে, ভাবল অভ্র।
দীপক চলে গেল। দীপক যাওয়ার পর নাজিয়া ফিরল অভ্রর দিকে, ‘খবরদার তুই খেলবি না। সামনে পরীক্ষা, সে খেয়াল আছে?’
‘পরীক্ষা তো অনেক আসবে,’ জবাব দিল অভ্র। ‘তাই বলে এমন খেলা মিস করা যায় না।’ মাথা নাড়লো অভ্র।
‘তাহলে তুই তোর খেলা নিয়ে থাক,’ উঠে দাঁড়ালো নাজিয়া। ‘আমি চললাম।’ বলেই নিজের ব্যাগ তুলে হাঁটা ধরল নাজিয়া। একবার পিছন ফিরে না তাকিয়েই সোজা চলে গেল। নাজিয়ার যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে কি যেন ভাবল অভ্র। একবার মাথা নাড়লো, পরে অভ্রও বেরিয়ে গেল।
পরদিন। সময় মতো বাসা থেকে বের হলো অভ্র। নিজের পছন্দের আর্জেন্টিনার সব থেকে সুন্দর জার্সিটা গায়ে চাপিয়ে মাঠের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। অভ্র জানে, ওকে ছাড়া দল হবে না। তাও নিয়ম রক্ষার জন্য যাওয়া। যাওয়ার পথে দেখা হলো রাতুলের সাথে। রাতুল অভ্রর ভার্সিটির খুব কাছের বন্ধু। ব্রাজিলের জার্সি তার পরনে।
‘কি রে, কোথায় যাস?’ জিজ্ঞেস করল রাতুল।
‘মাঠে যাচ্ছি,’ জবাব দিল অভ্র। ‘আজ তো সিলেকশন আছে। তুই খেলছিস?’
‘হ্যা, খেলছি। আমাদের সিলেকশন সকালে হয়ে গেছে। এখন প্র্যাকটিস।’ রাতুল খুব ভালো খেলে। ডিফেন্ডার হিসেবে ওর তুলনা ও নিজেই। ভার্সিটি টুর্নামেন্টে ওদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পিছনে অভ্রর যেমন আক্রমণে অবদান ছিল, রাতুল তেমনি রক্ষণে রক্ষাকবজ হিসেবে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কথা বলতে বলতে ওরা মাঠের সামনে এসে পড়েছে। অভ্র চলে গেল ট্রায়াল দিতে, আর ব্রাজিল দলে যোগ দিতে চলে গেল রাতুল।
তিন ঘন্টা ধরে চলল ট্রায়াল। অভ্রসহ ২২ জনকে বাছাই করা হলো আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল এই ফুটবল ম্যাচের জন্য। কাল থেকে শুরু হবে প্র্যাকটিস।
সেদিন যে চলে গেল এরপর থেকে নাজিয়ার কোনো খবর নেই। খুব রাগ করেছে মনে হয়। ফোন ধরছে না, মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছে না। সারাদিন খুঁজে অবশেষে লাইব্রেরির এক কোণে খুঁজে পাওয়া গেল। প্রথমে কিছুটা ভাব নিয়ে কথা না বললেও পরে সব ঠিক হয়ে গিয়েছে দুজনের মাঝে।
অভ্র লক্ষ্য করল, এই খেলা নিয়ে ভার্সিটির মধ্যে অনেক কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে রেষারেষি ভাব চলে এসেছে। এসব ওর পছন্দ হয় না। ওর ভার্সিটিতে একটা জনপ্রিয়তা আছে। মনে হচ্ছে সে সব হারিয়ে যেতে বসেছে আর্জেন্টিনার পক্ষে খেলছে বলে। ব্রাজিলের সমর্থকদের বাঁকা চোখে তাকানোয় ওর বিরক্তি ধরে গিয়েছে।
এভাবেই দিন কাটছে। খেলার দিন ঘনিয়ে আসছে। দুই দলে সুযোগ পাওয়া খেলোয়াড়েরা ঝালিয়ে নিচ্ছে নিজেদের।
অবশেষে সেই দিন। খেলার জন্য মাঠকে সাজানো হয়েছে নতুন করে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকেরা মাঠের চারিপাশে জায়গা দখল করে বসে আছে। মাঠে নামলো দুই দলের নির্ধারিত এগারো জন করে খেলোয়াড়রা। অভ্র ও রাতুল একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ালো। নিতেন স্যার পালন করবে রেফারীর দায়িত্ব।
স্যারের বাঁশিতে শুরু হলো খেলা। দুইদল মাঝ মাঠ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় আছে। তেরো মিনিট সময় বল অভ্রর পায়ে। দুর্দান্ত সলো দৌড়ে ডিবক্সে ঢুকে পড়েছে। আড়াআড়ি পাসে বলটা সৌরভের কাছে। দুর্দান্ত শটে গোল।
আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেছে ১-০ গোল। এর তিন মিনিট পরে আবার অভ্র বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময় রাতুলের একটি স্লাইডিং ট্যাকেল। চোখে অন্ধকার দেখলো যেন অভ্র। পায়ে হাত দিয়ে বসে পড়ল। সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নাজিয়া বুঝতে পারল অঘটনটা বোধহয় ঘটেই গেছে। দীপক গোলবারের সামনে থেকে ছুটে আসছে প্রিয় বন্ধুটিকে দেখতে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ঘিরে ধরেছে অভ্রকে। মেডিকেল টিম দ্রুত মাঠে ঢুকে পড়েছে। খেলার জন্য ভার্সিটির পাশের ফার্মেসি থেকে একজন ডাক্তার ও দুইজন সহযোগীকে আনা হয়েছে খেলোয়াড়দের শুশ্রূষার জন্য। অভ্রকে পরীক্ষা করে বুঝল মনে হয় পায়ের গোড়ালিটা ভেঙে গেছে। নিশ্চিত হতে এক্সরে করতে হবে। তারপরও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল অভ্র। ডান পায়ের উপর ভর দিতেই প্রচন্ড ব্যাথায় বসে পড়ল অভ্র।
নাহ, হবে না। খেলাটা আজ হচ্ছে না। মেডিকেল টিমের সদস্যদের কাঁধে ভর দিয়ে মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে অভ্র। যাওয়ার সময় চোখের কোণ দিয়ে দেখল, রাতুলের মুখে এক চিলতে হাসি। অভ্রর বুঝতে বাকি রইল না, ইচ্ছে করেই এই কাজ করেছে রাতুল। অভ্রের বদলি হিসেবে নামল আরেকজন।
নাজিয়ার পাশে যেয়ে বসে পড়ল অভ্র। মুখে কোনো কথা নেই। অভ্রর কাঁধে হাত রেখে অভয় দিল। চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিল, ব্যাপার না। কিছু হবে না। ইলিয়াস স্যার এসে অভ্রর পা’টা দেখল একবার। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যেতে বলল। কিন্তু অভ্র যেতে রাজি হলো না। খেলাটার শেষ দেখে তারপর যাবে বলল।
এভাবেই খেলা চলছে। দ্বিতীয় অর্ধের শুরুতেই গোল দিয়ে সমতা এনে দিয়েছে ব্রাজিল। না খেলতে পারার আক্ষেপে পুড়ছে অভ্র। দুই দল সমানে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আর গোল করতে পারেনি কোনো দল। শেষ বাঁশি বাজার পর খেলা শেষ। ১-১ গোলে ড্র।
খেলা শেষ হওয়ার সাথে সাথে যখন দুইদলের খেলোয়াড়েরা একে অপরের সাথে হাত মেলাতে ব্যস্ত, দীপক দৌড়ে ছুটে আসছে অভ্রকে দেখার জন্য।
‘পায়ের কি খুব খারাপ অবস্থা?’ হাটু গেড়ে অভ্রর সামনে বসে জিজ্ঞেস করল দীপক। মাথা নেড়ে সায় জানালো অভ্র।
‘ওকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে,’ বলল নাজিয়া। ‘পা’টা ভেঙে গেছে মনে হয়।’
‘আচ্ছা, তোরা থাক। আমি ট্যাক্সি ডেকে আনি।’ চলে গেল দীপক।
ওদিকে খেলোয়াড়দের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হচ্ছে। আড় চোখে অভ্রকে দেখছে রাতুল। ওর এখন মনে হচ্ছে, এমন না করলেও হতো।
‘চল, ট্যাক্সি এসে গেছে।’ দীপক এসে জানালো। নাজিয়া ও দীপকের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো অভ্র। অভ্রকে চলে যেতে দেখে ছুটে আসছে রাতুল।
‘অভ্র,’ পিছন থেকে ডাক দিল রাতুল। থমকে দাঁড়ালো তিনজন। দীপকের কাছে অভ্রকে দিয়ে রাতুলের মুখোমুখি হলো নাজিয়া।
‘কি চাই?’ জিজ্ঞেস করল নাজিয়া।
‘অভ্রর কি অবস্থা?’
‘তোর জেনে কি কাজ? তোর পুরস্কার দিচ্ছে, ঐখানে যা।’
‘না, আসলে…’
‘আসলে কি? ওর পা ভেঙে শান্তি হয়নি?’
‘আ…আমি ইচ্ছে করে করিনি।’
‘তুই কি করেছিস সেটা আমরা সবাই দেখেছি। এখন এখান থেকে যা। অভ্রকে হাসপাতালে নিতে হবে।’
‘আমি আসবো?’
‘কোনো দরকার নেই। আমরা ম্যানেজ করতে পারব।’ বলেই হনহন করে হাঁটা ধরল নাজিয়া। অভ্র নাজিয়ার কথার কোনো বাঁধা দেয়নি। রাতুল বুঝল, অভ্রও একই ভাবনা নিয়ে আছে।
নাজিয়া আর দীপকের কাঁধে ভর দিয়ে ট্যাক্সিতে উঠল অভ্র। ট্যাক্সি চলতে শুরু করলো। যতক্ষন চোখ যায়, পিছন থেকে তাকিয়ে রইলো রাতুল। ট্যাক্সিটা চোখের আড়াল হতেই একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে।
একটি বাইরের দেশের জন্য নিজের কাছের বন্ধুটিকে হারাতে হলো এভাবে…