বৃষ্টিতে ভেসে যাক দুঃখ, বাতাসে ভেসে বেড়াক সুখের সুবাস | বইয়ের রিভিউ


বৃষ্টিতে ভেসে যাক দুঃখ, বাতাসে ভেসে বেড়াক সুখের সুবাস | বইয়ের রিভিউ


বই: বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ

লেখক: শরীফুল হাসান

রিভিউ লিখেছেন : রেহনুমা রুবায়েত প্রাপ্তি 

প্রকাশনী: অন্যধারা

মুদ্রিত মূল্য: ৬৪০ টাকা

 

ঝড়ো হাওয়ায় ভেসে আসছে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ। অন্ধকার চারদিক। চোখ মেলে দেখা যাচ্ছে না কিছুই। শুধু পাওয়া যাচ্ছে একটা ঘ্রাণ। বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ। সে বৃষ্টি ধুয়ে মুছে নিয়ে যাবে সকল দুঃখ। নতুন সূচনা করবে।

আমরা মানুষ। আমাদের বলা হয় ❛আশরাফুল মাখলুকাত❜ বা ❛সৃষ্টির সেরা জীব❜। সৃষ্টির শুরু থেকেই আমরা মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আছি। সেটা সেই আদিকালের যু দ্ধ-বি গ্র হ হোক কিংবা কাছের অতীতের কোনো লড়াই-ই হোক না কেন। বাঙালি জাতির তেমনি একটু অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ছিল ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধে আমাদের অর্জন যেমন ছিল তেমনি ছিল হারানোর বেদনা। আমরা অর্জনটাকে স্মৃতিতে রেখে হারানোর বেদনা ভুলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সবাই কি পেরেছে হারানোর বেদনা ভুলে যেতে? যুদ্ধে পরিবার পরিজন হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কখনও খোঁজ রেখেছি নিঃস্ব হওয়া সেই মানুষগুলোর কথা? একা একা বাঁচার নতুন সংগ্রামে তারা কীভাবে দিন কাটাচ্ছে, কখনও তো ভেবে দেখেনি।

যুদ্ধে বাবা-মা-ভাই হারানো এক অসহায় শিশু। সীমান্ত পেরিয়ে চার-পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশুর আশ্রয় হয় কলকাতার এক চার্চে। যার দায়িত্বে আছে রেভারেন্ড হেনরি সরকার। অসহায় শিশু রেভারেন্ডের কাছে লেখাপড়া শিখে ভালোই দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল। একাত্তরের নির্বাসিত ছোট্ট শিশুর জীবন কি এতই সহজ হবে?

কাঁধে ব্যাগ, পকেটে নিজের ঠিকানা আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে স্টেশনে ঘুরতে থাকা বালক দেখা পায় মাধবী সাহা নামে একজনের। মাধবীর সাথে থাকতে শুরু করে। আশায় থাকে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে একদিন যাবে জন্মভূমি বাংলাদেশে। অপেক্ষার পালা শেষ হয় একদিন। বিশ্বনাথ নামে একজনের সাথে পাড়ি দেয় সীমান্ত। পা রাখে জন্মভূমি বাংলাদেশে। উদ্দেশ্য শিকড়ের সন্ধান।

একাত্তরের নির্বাসিত সেই ছোট্ট ছেলেটি আবু সালেহ চৌধুরী পিন্টু। জীবনের তাগিদে সে হয়েছিল অ্যালবার্ট পিন্টো অথবা গৌরহরি সাহা। ধর্মের ব্যবধান পেরিয়ে তিনটি ধর্মেই যার বাস ছিল। ছোট্টবেলায় যে বুঝে গিয়েছিল একাকিত্ব কী। ছোটো হৃদয়ে সে বুঝে নিয়েছিল জীবনের অনেক কঠিন মানে।

পিন্টু, পিন্টো কিংবা গৌরহরি হয়ে সে জীবনের বিভিন্ন স্বাদ পেয়েছিল। পেয়েছিল ভালোবাসার সন্ধান। শিকড় খুঁজতে থাকা ছেলেটি তৈরি করে নিয়েছিল নতুন শিকড়।

বিশ্বনাথের সাথে ঢাকায় সরকার বাড়িতে গৌরহরি রূপে নতুন জীবন শুরু করে। সরকার বাড়ির লোকেদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে কাটিয়ে দেয় দীর্ঘসময়। পরিবার আপনজন বলতে তাদেরকেই বুঝে সে। বিশ্বনাথ বা বিষ্ণুর ভাইয়ের মতো ভালোবাসা, রাঙা মায়ের মমতা, বাড়ির সকলের তাকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা সবকিছু নিয়েই গৌরহরির জীবন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু জীবন যে তার জন্য থিতু হয়ে থাকা লিখে রাখেনি তা সে ভালোই জানে। নিয়তির টানে তাকে ছুটে চলতে হয়। এ ছুটে চলার ইতি কি আছে?

পূরবীর স্বপ্ন ডাক্তার হবে। গায়ে অ্যাপ্রোন জড়িয়ে, গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে বাবার সামনে যখন দাঁড়াবে তখন মনে হবে জীবনে সব স্বপ্ন বুঝি সত্যি হলো। জীবনে এর থেকে বেশি কিছু দরকার নেই। ডাক্তার হবার স্বপ্নকে বুকে লালিত করে তোড়জোড় করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েটের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে জয়ী সে হবেই। বাবা, মা, বোন, ঠাকুমা আর কাকাদের সাথে একান্নবর্তী পরিবারের সকল সুখ নিয়েই কেটে যাচ্ছিল পূরবীর জীবন। কিন্তু মনের মাঝে একটা ভয় যা সে লালিত করে আসছে সেই কিশোরী বেলা থেকেই। ভয়ের নাম ❛সেলিম খান❜। এলাকার হোমরাচোমরা, বড়োলোকের বখে যাওয়া ছেলে সে। চোখ দিয়েছে তার দিকে। রাস্তায় পথ আটকে, নানা রকম উক্তি করে বিরক্ত করে তাকে। বাসায় এসব বলে কাউকে চিন্তায় ফেলতে চায়না সে। ৯০ এর দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে সংখ্যালঘু হয়ে এমনিতেই তারা জড়োসড়ো হয়ে দিন কাটায়। এরপর মেয়ে হবার কারণে এসব উপদ্রব ভোগ করতে হয় বলে মাথার উপরে সকলের অলক্ষ্যে থাকা ঐ ঈশ্বরকে দায়ী করে সে। ছেলে হলে কি সে সেলিম খানের মতো হতো? কখনই না! সেলিম খানের হাত থেকে রক্ষা পাবার কোন উপায় জানা নেই। একা একা প্রতিরোধ করে কতদিন? তার স্বপ্নের মাঝে কালো গ্রাস হয়ে একদিন ছোবল দিবেই সেলিম। পারবে কি নিজেকে রক্ষা করতে?

১৯৯৫ এর এক ভোরে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে পাওয়া গেল আগুনে পুড়ে যাওয়া এক লা শ। লা শে র পকেটে পাওয়া গেল একটা চিরকুট। সেখানে একটাই নাম লেখা। চিরকুটে নাম লেখা ব্যক্তিই কি এই মৃ ত ব্যক্তি? ওসি আমিন উদ্দিন কুল কিনারা পাচ্ছেন না।

এদিকে অবসরের সময় ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি আবু জামশেদকে পুড়ে যাওয়া অজ্ঞাত লা শে র অমীমাংসিত কেসের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল সদ্য অবসর নেয়া ওসি আমিন উদ্দিন। আবু জামশেদ চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। অতীত বলে চ্যালেঞ্জে হারে না জামশেদ। পারবে কি এবারও রেকর্ড ধরে রাখতে?

পিন্টু, পিন্টো কিংবা গৌরহরির জীবন কেমন হয়েছিল? বাতাসের মতো ভেসে বেড়ানো জীবন কী থেমেছিল না চক্রের মতো বাঁক খেয়েই যাচ্ছিল?

গৌরহরি, পূরবী কিংবা পুড়ে যাওয়া অজ্ঞাত সেই লাশের মধ্যে কোনো যোগাযোগটা কোথায়?

পাঠ প্রতিক্রিয়া:

বই পড়া শেষ করে ঘন্টাখানেক ধরে শুধু ভেবেছি কী লিখবো বা কীভাবে শুরু করবো? এবারের মেলার প্রকাশিত নতুন বইয়ের মধ্যে ❝বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ❞ ছিল অন্যতম। বইটা প্রকাশের পর এর অনেক ভালো রিভিউ দেখার পরেও অনেকদিন সময় নিয়েছি নিজে পড়তে। পড়া শুরুর পর এক ঝটকায় শেষ করে ফেলেছি। ৪১৫ পৃষ্ঠার বই মনে হলো এক একটু আগে না শুরু করলাম। সেজন্য লেখককে কৃতিত্ব দিতেই হবে।

ভিন্ন কয়টা টাইমলাইনে গল্প এগিয়েছে। ১৯৭৫-১৯৯০, ১৯৯১-১৯৯৪, ১৯৯৫-১৯৯৮ আর সবশেষে উপসংহারে।

প্রথম টাইমলাইনে ছিল গল্পের প্রোটাগনিস্ট পিন্টু, পিন্টো কিংবা গৌরহরির জীবনের কাহিনি। এরপরের ভাগে পূরবী, এরপর পু ড়ে যাওয়া অজ্ঞাত লা শে র সন্ধানের কাহিনি। প্রতিটা টাইমলাইনের গল্প লেখক বেশ দক্ষ হাতে সাজিয়েছেন। কখনও পিন্টুর জন্য আবেগ তৈরি হচ্ছে, কখনো পূরবীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে যাচ্ছি আবার কখনও পো ড়া লাশটা কার হতে পারে সে নিয়ে দ্বিধায় ভুগছি। তবে অজ্ঞাত লাশের ব্যাপারটা বুঝে গেছিলাম বেশ আগেই। তাতে উপন্যাস পড়তে অনীহা জাগেনি মোটেই। বরং তাতে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে যাচ্ছিলাম।

পুরোনো দিনের আবহে লেখা উপন্যাস পড়তে আমার বরাবরই একটু বেশি ভালো লাগে। সেক্ষেত্রে ৭০-৯০ এর দশকের বর্ণনা পড়তে অবশ্যই অন্যরকম ভালো লেগেছে। লেখক এই সময়ের মাঝে যুদ্ধ পরবর্তী সদ্য ভূমিষ্ঠ বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর মৃ ত্যু পরবর্তী শাসন, এরশাদের শাসন আর তখনকার সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাথে সংখ্যালঘুদের জীবন নিয়ে দারুণ বর্ণনা দিয়েছেন। সরকার বাড়ির একান্নবর্তী পরিবারের সকলের পারিবারিক বন্ধন যেভাবে দেখিয়েছেন, ঠিক ততোটাই সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন পূরবীর পরিবারের বন্ধন। ভাইয়ে-ভাইয়ে বন্ধন, একজনের বিপদে অন্যজনের চোখ ছলছল হয়ে যাওয়া এ ব্যাপারগুলো বেশ ভালো লেগেছে।

একইসাথে কিশোরীকালে বেশিরভাগ মেয়ে যে সমস্যাটার মধ্যে দিয়ে যায় সে বিষয়েও লেখক আলোকপাত করেছেন। বখাটে ছেলের উত্তক্ত করা নিয়ে মনে তৈরি হওয়া ভয়, লেখাপড়া করে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প, সাথে জীবনে পাশে একজন সাথী পাওয়ার বাসনার কথা সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন।

পিন্টুর শিকড়ের খোঁজ করতে দেশে আসা, নতুন এক পরিবারে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া, প্রথম প্রেমে পড়া, দায়িত্বের খাতিরে, কৃতজ্ঞতার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়া এসব কিছু পিন্টু কিংবা গৌরহরি চরিত্রকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। শৈশব থেকে সময়ের তাগিদে তিনটি ধর্মের পরিচয়ে বড়ো হয়েছে সে। নিজের অস্তিত্বের জন্য ছুটে চলেছে সীমান্তের বাঁধা পেরিয়ে। মনের গহীনে লালন করা ভালোবাসা নিয়ে বাস করেছে সমাজে। পিন্টুর ছোটবেলার জীবন নিয়ে অনুধাবন গুলো একেবারে অসাধারণ ছিল। কিশোর বয়সেই জীবনে কঠিন কিছু সত্য মেনে নিয়ে বড়ো হয়েছে সে। এসবই অনন্যতা দিয়েছে তাকে।

গল্পের তাগিদে আসা প্রতিটা চরিত্র ছিল আপন আলোয় আলোকিত। কাউকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়নি। দীর্ঘ কলেবরের বই হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে লম্বা বানানোর প্রয়াস ছিল এমনটা লাগেনি।

লেখকের গল্প লেখার ধরন, আবহ তৈরির প্রশংসা করতেই হবে। পুরোনো দিন নিয়ে লেখা লেখকের ❛ছায়া সময়❜ পড়েও মুগ্ধ হয়েছিলাম। তার থেকেও বেশি ভালো লেগেছে ❛বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ❜। উপন্যাসের কাহিনির সাথে নামটা একেবারে যথার্থ।

তবে উপন্যাসে কিছু জায়গায় আমার একটু না পাওয়া প্রশ্ন রয়ে গেছে। যেমন, হুকনা কামালের লোকেরা এক পর্যায়ে কেন গৌরহরিকে ❛পিন্টু❜ নামে সম্বোধন করলো? এই নাম তাদের জানার কথা না। অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে।

এছাড়াও, শুরুতে সামাদের বোনের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ব্যাপারটা খোলাসা করেনি। সেটা অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

ওসি আমিন উদ্দিনের মাথায় কোন পোকা ঘুরছিল যার উত্তর বের করতে পারছিলেন না তিনি? সেটাও খোলাসা হয়নি।

তবে এগুলো খুব বিশেষ কিছু না। এতে করে উপন্যাস পড়ায় কোথাও খাদ তৈরি হয়নি। পুরোটা সময়ই উপভোগ করেছি।

প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:

বইয়ের প্রচ্ছদ একেবারে সাধারণ। তবুও চোখে লাগার মতো। সাধারণ প্রচ্ছদটাও দেখে অসাধারণ লেগেছে। অন্যধারা প্রকাশনীর বই বাঁধাইয়ের মান খুবই ভালো। পৃষ্ঠাগুলোও উন্নত মানের ছিল। বই পড়তে অসুবিধা হয়নি। তবে সম্পাদনার দিকে নজর দেয়া জরুরি। সাধারণ কিছু বানানে ভুল ছিল। এক জায়গায় পিন্টুর ভাইয়ের নাম ❛মিন্টু❜ লেখার বদলে ❛মন্টু❜ লেখা হয়েছিল।

সব মিলিয়ে ❝বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ❞ উপভোগ্য একটা উপন্যাস। লেখকের থেকে এরকম অসাধারণ লেখা আরও আশা করি।

এক বাক্যে বলতে বললে বলবো, ❝বিষন্ন সুন্দর❞।

কীসব আবোল তাবোল লিখেছি জানি না। এত দারুণ উপন্যাস নিয়ে কী লিখবো সেটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না।