ব্রাজিলকে বাঁচানো এক অকুতোভয় বাঙালি বীর



অকুতোভয় সেনানী, এক বাঙালি কিংবদন্তি  সুরেশচন্দ্র বিশ্বাস। যিনি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে ১৮৯৩ সালে ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনিরো কে বাঁচিয়েছিলেন। সেই অদ্বিতীয় বীর বাঙালিকে নিয়েই আজকের আয়োজন।

পুরো নাম সুরেশচন্দ্র বিশ্বাস।  জন্ম ১৮৬১ সালে, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নাথপুর গ্রামে। পিতা গিরিশচন্দ্র বিশ্বাস ছিলেন ছোটখাটো একজন সরকারি চাকুরে। তার দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সুরেশ ছিল সবার বড়।

দুরন্ত-দস্যিপনা বালক ছিলেন সুরেশ। মাত্র দু’বছর বয়সে বিশ ফুট উঁচু মইতে উঠেছিলেন। ছোটবেলায় খেলার ছলে কখনোবা ছোবলোদ্যত সাপের ফনা নিজের হাতে ধরেছেন। আবার কখনো ক্ষিপ্ত বন্য শূকরকে সম্মুখসমরে আঘাত করে ভূপাতিত করেছেন। রামায়ণ-মহাভারত আর ইতিহাসের বীরদের গল্পেই যেন তার সবটুকু আগ্রহ। কিশোরকালে খেলাধুলার থেকে শরীরচর্চাই ছিল তার মনোযোগের বিষয়। সেসময় সবাই বুঝেছিলো, এ ছেলে অন্য সবার মতো হবে না।  তা বলে পৃথিবীর এক প্রান্তের ছেলে জয় করবে অন্য আর এক প্রান্ত এমন করে কেই বা ভেবেছিলো? শোনা যায়,সুরেশের পূর্বপুরুষেরা নীলবিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।  এই সেই বাঙালি ছেলে, যাকে নিয়ে স্বয়ং রবি ঠাকুর বলে গেছেন-

‘দেখা হলেই মিষ্ট অতি
মুখের ভাব শিষ্ট অতি,
অলস দেহ ক্লিষ্টগতি-
গৃহের প্রতি টান।
তৈল-ঢালা স্নিগ্ধ তনু
নিদ্রারসে ভরা,
মাথায় ছোট বহরে বড়ো
বাঙালি সন্তান।’

একটা সময় কলকাতার বালিগঞ্জে থিতু হলো সুরেশের পরিবার। সুরেশ ভর্তি হলেন লন্ডন মিশন কলেজে। কিন্তু পড়াশোনায় মন থাকলে তো! সারাদিন তাস খেলে বেরানোতেই তার আনন্দ। একারণে মাসে দশদিনও ক্লাসে যেত না সে। মায়েরও কিছুটা সমর্থন ছিল তাতে। কিন্তু বেশিদিন ছেলেকে বাবার থেকে আড়াল করতে পারেননি তিনি। ছেলেকে সুপথে আনার অনেক চেষ্টাই করলেন সুরেশের বাবা গিরিশবাবু। তাতে ছেলের বিগড়ানো আরও বাড়লো ! আগে তবুও ছেলে বাড়িতে ফিরতো, বাবার শাসন শুরু হবার পর থেকে বাড়িও ফিরতো না ঠিকমতো।

সুরেশ প্রায়ই তার অন্যান্য বন্ধুদের বাড়িতে থাকত। এভাবেই তার মা ও কাকা কৈলাসবাবু ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সকলের সাথে তার অনেক দূরত্ব তৈরি হল। এদিকে খ্রিস্টান বন্ধুদের সান্নিধ্যে এসে পূর্বপুরুষের ধর্মের ওপরেও আস্থা হারাতে থাকে সে। শেষমেশ একদিন সুরেশ তার বাবার ওপর অভিমান করে গৃহত্যাগী হলো এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করল।

বাড়ি ছাড়বার পর সুরেশ তার কলেজের অধ্যক্ষ মি. আটসনকে আশ্রয় হিসেবে  পেলেন । কলেজ হোস্টেলে তার থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত হয়ে গেল। তারপর অনেক জায়গায় চেষ্টা করেও চাকরি পেলেন না।  অবশেষে যখন দেখলেন চাকরির আর আশা নেই, ঠিক সেইসময় স্পেন্সেস হোটেলে ট্রাভেল গাইডের একটি চাকরি পেয়ে গেলেন তিনি।

নতুন এই কাজের মাধ্যমে অনেক ইউরোপীয় লোকজনের নিকট আসার সুযোগ পান সুরেশ।  কাজের ফাঁকে তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত পর্যটক ও অভিযাত্রীদের ভ্রমণকাহিক পড়তে শুরু করেন। সেই সময় বিলেতে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাকে নেশার মতন পেয়ে বসে । তাই চাকরি ছেড়ে একদিন রেঙ্গুনগামী জাহাজে চেপে বসলেন।

রেঙ্গুনে আসার পর চাকরি তো হচ্ছিলোই না, একবার তো ভাগ্যগুণে বেঁচে গিয়েছেন। সেদিন সন্ধ্যার সময় ইরাবতী নদীতে নৌকাভ্রমণ শেষে ঘরে ফিরছিলেন তিনি। । কোত্থেকে যেন দুটো ধারালো দা ছুটে গেলো সুরেশের পাশ দিয়ে। নিক্ষেপকারী দুজন  মগ ডাকাত। হুট করেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো সুরেশের ওপর। মল্লযুদ্ধে পারদর্শী সুরেশকে হারাতে ভালোই কষ্ট হচ্ছিলো ওই দুই ডাকাতের। এমন সময়, হঠাৎ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো একদল বরযাত্রী। তাদের দেখেই ডাকাতেরা পালিয়ে যায়। সেইবার এভাবেই সুরেশ বেঁচে যায়।

সুরেশের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক হলো মাদ্রাজ যাবেন। যেদিন রাতে মাদ্রাজ রওনা হবেন, সেদিন সন্ধ্যায় শেষবারের মতো রেঙ্গুনের পথে হাটতে বের হলেন। হঠাৎ আগুন লাগার শব্দ তার কানে এসে বাজলো।  পাশেরই এক বাড়িতে, দোতলার জানালা থেকে ভেসে আসছে এক নারীর আর্ত-চিৎকার। সুরেশ প্রবেশ করলেন সেই অগ্নিকুণ্ডে। বাঁচালেন সেই মগ নারীর জীবন। সুরেশের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে মগ মেয়েটি ভালোবেসে ফেলে সুরেশকে।  কিন্তু তার ভবঘুরে, ছন্নছাড়া জীবনের সাথে জড়াতে চাননি সেই তরুণীর জীবন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠে পড়েন মাদ্রাজগামী জাহাজে।

মাদ্রাজ এসে সুরেশের সমস্যা আরও যেন প্রকট হল। কারণ তিনি  ভাষা জানতেন না। তামিল-তেলেগু ভাষা না জানায় কোনো কাজই পাচ্ছিলেন না সেখানে। যখন কোনকিছুতেই কাজ পাচ্ছিলেন না সিদ্ধান্ত নিলেন সমুদ্রতীরে আত্মহত্যা করবেন। এবং ঠিক সেই মুহূর্তে দেবদূতের মতো সেখানে হাজির হলেন এক ফিরিঙ্গি সাহেব। তার দুই নাতির দেখাশোনার কাজ দিলেন তিনি সুরেশকে। কিছুদিন এই চাকরি করার পর আবারও কলকাতায় ফিরে যান তিনি।

তবে ততদিনে শিক্ষার গুরুত্বটা বেশ ভালই টের পাচ্ছিলেন সুরেশ। তাই কাজের ফাঁকে বই পড়া শুরু করলেন। অন্যদিকে তার মন পড়ে আছে বন্দরে, সমুদ্রে। একটু খানি সুযোগ পেলেই জেটিতে ঘুরে আসতেন। উদ্দেশ্য, ছিল মদ খাওয়ায় জাহাজীদের সাথে মেশা আর বিভিন্ন দেশের গল্প শোনা। এভাবেই একদিন বিলেত যাবার স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেলো সুরেশের। বি. এস. এন নামের এক কোম্পানির জাহাজের ক্যাপ্টেনের সুবাদে জাহাজের সহকারী স্টুয়ার্ডের চাকরির পর প্রায় ১৮ বছর বয়সে দেশ ছাড়লেন তিনি।

বিলেতে যাওয়ার পর বোসেন নামক জাহাজের এক বন্ধুর সাহায্যে ইস্ট অ্যান্ড পল্লীতে একটি ঘর ভাড়া নেন।  কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকা হয়নি তার।চাকরি না পেয়ে বরং গৃহহীন হয়ে পড়েন সুরেশ। এরপর অভাবের কারণে খবরের কাগজ বিক্রি করতেন, কখনোবা ফেরি করতেন। এরই মধ্যে এক বিবাহিতা নারীর প্রেম থেকে বাঁচতে সেই শহর থেকেই চলে গেলেন তিনি। ফেরিওয়ালা হয়ে বেরিয়ে পড়লেন ইংল্যান্ডের গ্রামের উদ্দেশে। তারই মাঝে গণিত, জ্যোতিষ, রসায়ন ইত্যাদি নানা বিষয়ে পড়াশোনাটাও চালিয়ে যেতে লাগলেন।

এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে কেন্ট প্রদেশে এসে পড়লেন। সেখানে এক সার্কাস দল খেলা দেখাচ্ছিলো। সার্কাস দলের সবচেয়ে শক্তিশালী লোকটিকে কিছুক্ষণের মধ্যে পরাজিত করে সার্কাসে চাকরি পেয়ে গেলেন। বেতন পেতেন সপ্তাহে মাত্র ১৭ সিলিং। হিংস্র পশু বশ এবং বাঘ-সিংহের খেলা দেখানোয় অল্প সময়েই বেশ পারদর্শিতা অর্জন করলেন তিনি। এখানেও প্রেমে পড়লেন সুরেশ।  সার্কাস দলের এক জার্মান সুন্দরীর প্রেমনিবেদনেও মন গলেনি সুরেশের। লন্ডন ছেড়ে মেয়েটি যেদিন জার্মানি চলে যাবে, সেদিন সুরেশ তাকে বলেছিলো-

“তোমার আমার মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আমাদের বিয়ের সম্ভাবনা নেই। আমাকে ভুলে যাও। যদি পারি, আমিও ভুলবার চেষ্টা করবো।”

২১ বছর বয়সেই বাঘ-সিংহের খেলা দেখিয়ে ব্রিটেন থেকে সারা পৃথিবীতে নিজেকে চেনালেন তিনি। এরপর জার্মানির হামবুর্গে একটি পশুশালায় চাকরি নেন তিনি।  এখানে ‘ফ্যানি’ নামক একটি বাঘকে শৈশব থেকে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। সেসময় বাঘটি সুরেশের কাছে কুকুরের চেয়েও বেশি অনুগত হয়ে ওঠে। এছাড়াও, একটি হাতিকেও তিনি এমনই পোষ মানিয়েছিলেন যে, তিনি না খাওয়ালে সে খেতোই না। পশুপ্রশিক্ষণে ক্রমেই নাম করছিলেন সুরেশ। তার প্রশিক্ষিত সমস্ত পশু অনেক বেশি দামে বিক্রি হতে শুরু করলো।

হঠাৎই আবার একদিন সেই জার্মান যুবতীর সাথে দেখা হয়ে গেল তার! এবার দুজনের কেউই একে অপরকে ছাড়তে চাননি। কিন্তু দুর্ভাগ্যেবশত মেয়েটিকে পাওয়ার জন্য কিছু মানুষ সুরেশকে হত্যার জন্য আততায়ী নিযুক্ত করলো। সেইবার প্রাণ বাঁচাতে একরকম বাধ্য হয়েই এক সার্কাস দলের সাথে সুরেশ চলে গেলেন আমেরিকায়। সেখানে বিভিন্ন জায়গায় খেলা দেখিয়ে ১৮৮৫ সালের দিকে সুরেশ মেক্সিকো হয়ে ব্রাজিলে যান।বলা হয় তার আগে অন্য কোন বাঙালি ওই অঞ্চলে যাননি। এবং এখান থেকেই সুরেশের উত্থান ঘটতে শুরু করে।

এই জায়গায় তার আর ভাষার সমস্যা হল না। এরই মধ্যে সুরেশ ইংরেজি, পর্তুগিজ ভাষাসহ প্রায় সাতটি ভাষা জানতেন।এছাড়াও, ব্রাজিলের প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে সেখানেই স্থায়ী থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরে সেখানকার রাজকীয় পশুশালায় একটি চাকরিও পেয়ে গেলেন। এখানে তিনি গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্য, গণিত, দর্শন, রসায়ন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গভীর মনোযোগের সাথে চর্চা করা শুরু করলেন। স্থানীয় ‘লা ক্রনিকা’ নামের এক পত্রিকাসূত্রে জানা যায় যে, সুরেশ বিভিন্ন জায়গায় এই বিষয় গুলোর উপর আলোচনা করতেন। এখানে তিনি ডেসডিমোনা নামের এক স্থানীয় চিকিৎসকের মেয়ের প্রেমে পড়েন। তবে এবার আর কোনো ঝামেলা নয়। ১৮৮৯ সালে একেবারেই বিয়ে করে ফেললেন দুজন।

সে সময় তার স্ত্রীর অনুপ্রেরণাতেই ব্রাজিলের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন সুরেশ। প্রথমে তিনি, ১৮৮৭ সালে কর্পোরাল, পরবর্তীতে সার্জেন্ট এবং ১৮৯৩ সালে লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। সুরেশ নামের এই বীরকে  যোদ্ধা পর্যায়ে আসতে জীবনের ঠিক এতগুলো ধাপই পেরোতে হয়েছে! চলুন জেনে নেয়া যাক তার যুদ্ধে জয়ী হওয়ার গল্প-

১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো। ভয়াবহ নৌবিদ্রোহের কবলে দেশ। রাজধানী রিও ডি জেনিরোর চারপাশ থেকে একযোগে গোলা ছুঁড়ছে শত্রুশিবিরের প্রায় বিশটি যুদ্ধজাহাজ। থেমে থেমে গর্জে উঠছে কামান। বিদ্রোহীদের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্রাজিলীয় সেনারাও পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে, যেন কেউ কারো চেয়ে কম নয়।

বিদ্রোহীরা ততক্ষণে বুঝে গেছে, এইভাবে জিততে পারবে না তারা। মুহূর্তেই পরিকল্পনা পাল্টে তারা নাথেরয় নামক শহরের দিকে আগাতে থাকে, এবং খুব সহজেই সেখানকার দখল নিয়ে নেয়। এ ঘটনায় প্রচণ্ড বিচলিত হয়ে পড়লেন নাথেরয় রক্ষণের দায়িত্বে থাকা সেনাপতি। সেসময় তার হাতে ছিলো মাত্র পঞ্চাশজন সেনা। এই সামান্য শক্তি নিয়ে জিততে হলে দরকার একজন অকুতোভয় বীর সেনানী। এসময় ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন এক পরাক্রমশালী এক বীর বাঙালি, নাম তার সুরেশচন্দ্র বিশ্বাস, লেফটেন্যান্ট সুরেশচন্দ্র বিশ্বাস। মাত্র  সেই পঞ্চাশজন সৈন্য নিয়েই নাথেরয় শহর পুনরুদ্ধার করলেন তিনি। এবং দমন হলো বিদ্রোহ।

এভাবেই ঘরপালানো সেই সুরেশ সারা পৃথিবীতে সৃষ্টি করলেন এক অমর কীর্তি, সুদূর ব্রাজিলে হয়ে উঠলেন বাঙালির বীর প্রতিনিধি। অদ্বিতীয় সেনানায়ক, কিংবদন্তি সুরেশচন্দ্র বিশ্বাস।  অবশেষে, ১৯০৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রিও ডি জেনিরো রক্ষাকারী হিসেবে খ্যাত সুরেশ বিশ্বাস তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে রেখে পরপারে পাড়ি জমান।

শিশুসাহিত্যিক ময়ূখ চৌধুরী সুরেশকে নায়ক করে লিখেছেন ‘বঙ্গঁদেশের রঙ্গঁ’, বনফুল লিখেছেন ‘বিশ্বাস মশাই’। সত্যজিৎ রায়ের ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’, বিমল মুখার্জির ‘ দুচাকার দুনিয়া’-তেও আমরা বাঙালি সেই বীর অভিযাত্রী সুরেশ বিশ্বাসের নামটি খুঁজে পাই।