‘মানষে আমার সর্বনাশ করেছে, আল্লাহ তাগো বিচার করো’


jahalom #paperslife.com

কারাগার থেকে ভাই শাহানূরের সঙ্গে সোমবার ভোররাত চারটায় গ্রামের বাড়িতে আসেন জাহালম। এ সময় তাদের মা মনোয়ারা বেগম ছেলেকে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন

জাহালমের কপালে চুমু দিয়ে চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘কার মাথায় বাড়ি দিছিলাম যে আমার এত বড় সর্বনাশ করেছিল! মানষে আমার সর্বনাশ করেছে, আল্লাহ তাগো বিচার করো।’

জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইল। সে একজন পাটকল শ্রমিক। কোনো দিন ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ দূরের কথা, তার আর্থিক যে অবস্থা, তাতে হয়তো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না, সন্দেহ আছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক), সংস্থাটির কাজ কেউ দুর্নীতি করলে তাকে বিচারের জন্য সোপর্দ করা। সে জন্য দুদক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার নামে মামলা করতে পারে; এমনকি সেই মামলায় যাতে দুর্নীতিবাজের বিচার হয়, সে বিষয় আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়াও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

দুদক জাহালমকে ভয়ংকর ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে ৩৩টি মামলা দিয়েছে। আর সেই মামলায় তাকে তিন বছর বিনা বিচারে জেলে আটকও থাকতে হয়েছে। সোনালি ব্যাংক থেকে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন আবু সালেক নামের এক লোক। কিন্তু দুদক জাহালমকে সালেক বানিয়ে দিয়েছিল।

ইতিহাস বলছে দুদক বড় বড় দুর্নীতিবাজকে ধরতে পারে না, কিন্তু জাহালমের মতো নিরীহ মানুষকে জেল খাটাতে পারেনি। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছাড়া দুদকের মামলায় চূড়ান্ত বিচারে দণ্ডিত হয়েছে, এ রকম উদাহরণ খুব বেশি নেই।

এদিকে জাহালম যতই বলেছেন, ‘আমি সালেক না, আমি কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিইনি।’ কিন্তু দুদক ও পুলিশ জোর দিয়ে বলেছে, ‘না, তুমিই সালেক, তোমাকেই জেল খাটতে হবে। শাস্তি পেতে হবে।’

জাহালমকে হয়তো আরও দীর্ঘদিন জেল খাটতে হতো। গত ৩০ জানুয়ারি প্রথম আলোয় ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সেদিন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। শুনানি নিয়ে আদালত জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেন।

একই সঙ্গে নিরীহ জাহালমের গ্রেপ্তারের ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি, মামলার বাদী দুদক কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্রসচিবের প্রতিনিধি ও আইনসচিবের প্রতিনিধিকে ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় সশরীরে আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এরই ধারাবাহিকতায় নির্ধারিত দিন দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি হিসেবে দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত), মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল জাহিদ, স্বরাষ্ট্রসচিবের (সুরক্ষা) প্রতিনিধি যুগ্ম সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন এবং আইনসচিবের প্রতিনিধি সৈয়দ মুশফিকুল ইসলাম আদালতে হাজির হন।

আদালত দুদকের আইনজীবী ও প্রতিনিধিকে জিজ্ঞাসা করেন, যে তদন্ত কর্মকর্তারা জাহালমের নামে ভুলভাবে অভিযোগপত্র দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দুদক কী ব্যবস্থা নিয়েছে?

এরপর আদালত বলেন, ‘আপনারা অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবস্থা নিলে আমাদের হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন হবে না। আর সেটি না হলে আমরাই ব্যবস্থা নেব। জাহালমের ঘটনায় দুদক বা ব্যাংককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ শুনানিতে দুদকের আইনজীবী স্বীকার করেন, জাহালম ঋণগ্রহীতা নন। তিনি পাটকলের একজন শ্রমিক। বিষয়টি গত ডিসেম্বরে যখন তাদের নজরে আসে, তখনই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে দুদক। কিন্তু বাস্তবে সেই গুরুত্বের কোনো লক্ষণ নেই। গত ২৪ মে মানবাধিকার কমিশন জাহালম যে সালেক নন, সেটি জানিয়ে দুদককে চিঠি লেখে। এরপরও আট মাস চলে গেছে।

প্রথম আলোয় আসাদুজ্জামানের এই প্রতিবেদন ছাপা না হলে হয়তো জাহালম এখনো কারাগারে থাকতেন। এ জন্য প্রথম আলো ও আসাদুজ্জামান ধন্যবাদ পেতে পারেন। আসাদুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে ২০১০ সালে নিহত ছাত্র আবু বকর সিদ্দিককে নিয়েও এ রকম একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলেন। যাতে দেখা যায়, আবু বকর সিদ্দিক খুন হয়েছেন। কিন্তু তাকে কেউ খুন করেননি। মামলার সব আসামি বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন।

হাইকোর্ট বলেছেন, একমুহূর্তও আর জাহালমের কারাগারে থাকা উচিত নয়। এরপর গতকাল রাতেই তাকে কাশিমপুরে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।