রমজান মাসের তাৎপর্য ও আমল


রমজান-মাসের-তাৎপর্য-ও-আমল-ramadan-2021 #paperslife


রমজান শব্দটির মূল ধাতু ‘রামাজা’ এর অর্থ দহন, জ্বলন ও ছাই-ভস্মে পরিণত হওয়া। কেননা রোজা রাখার দরুন ক্ষুধা-পিপাসার তীব্র জ্বালায় রেজাদারের উদর জ্বলতে থাকে। ক্ষুধা-পিপাসার কী জ্বালা তা রোজাদার মর্মে মর্মে অনুভব করে বলেই রোজার মাসটির নাম রমজান রাখা হয়েছে।

আর রামাজা ধাতু হতে রামাজাউ শব্দটিও গঠিত হয়েছে। যার উত্তাপের তীব্রতা, জ্বলনের ক্ষিপ্রতা, অবস্থা অবস্থান ও পরিবেশের তাড়নায় রোজাদারের মধ্যে কখোনো কখোনো এই জ্বলন তীব্র রূপ ধারণ করে থাকে।

সহীহ বোখারী শরীফের হাদিসে উক্ত হয়েছে যে, সূর্যোদয়ের পর সূর্য কিরণের তাপে প্রাচীর যখন জ্বলে উঠে, তখনই আউয়্যাবিন নামাজ পড়ার সময়। বস্তুত : সূর্যের তাপের তীব্রতায় মানুষের মাথা হতে পা পর্যন্ত জ্বলন ধরিয়ে দেয়। সূর্য তাপ যতই তীব্র হয় জ্বলনের তীব্রতাও ততো বর্ধিত হতে থাকে। পুরো রমজান মাসটাই হলো অব্যাহত জ্বলন ও তীব্র দহনের একত্র সমাহার।

আর এই মাসটির রমজান নামকরণের কারণ হলো এই যে, এই মাসে রোজাদারগণ যে সকল নেক আমল করে; তা তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার ও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। নবী মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় এমন উক্তিই করেছেন।

কুরআনের সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে সিয়াম (সওমের বহুবচন) সম্পর্কে বলা হয়েছে:

‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা খোদাভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (২:১৮৩)

পরের দুই আয়াতে বলা হয়েছে:

১৮৪. নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনের (এক মাসের) জন্য রোজা ফরজ। অতএব এ সময় তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ বা সফরে থাকলে, তাকে অন্য সময়ে (মাসে) ঐ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। আর যাদের জন্য রোজা অত্যন্ত কষ্ট দায়ক, তারা এক দিনের পরিবর্তে একজন মিস্‌কীনকে খাদ্যদান করবে। তবে যে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আরো বেশি সৎকর্ম করবে তার জন্য আরো কল্যাণকর। অতএব কোন অযুহাত না দেখিয়ে যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর, যদি তোমরা বুঝতে পারতে।

১৮৫. রমজান মাসই হল সে মাস, মানুষের হেদায়েতের জন্য যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন। আর তা হেদায়েতের সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, তাকে এ মাসের রোযা রাখতে হবে। কিন্তু যে লোক অসুস্থ কিংবা সফরে থাকবে সে অন্য মাসে ঐ সংখ্যা পূরণ করবে। কারণ আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য (তাঁর বিধান) সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না যাতে তোমরা রোজার নির্দিষ্ট সংখ্যা পূরণ করতে পার এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ্‌ তা’য়ালার মহত্ত্ব ঘোষণায় সচেষ্ট থাকতে পার। আর আশা করা যায় তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবে।

সুরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রোজা প্রসঙ্গে আরও বলেছেন:

‘রোজার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা আত্নপ্রতারণা করছিলে, সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর এবং যা কিছু তোমাদের জন্য আল্লাহ দান করেছেন, তা আহরণ কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোজা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত। আর যতক্ষণ তোমরা এতেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে সহবাস করবে না। এই হলো আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমানা। অতএব, এর কাছেও যেয়ো না। এমনিভাবে বর্ণনা করেন আল্লাহ নিজের নিদর্শনগুলো মানুষের জন্য, যাতে তারা বাঁচতে পারে।’

রমজানে মূলত আল্লাহ-র প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করেন মুসলিমরা। এর আরেকটি দর্শন হল, গরীব-মিসকিনের ক্ষুধার্থ অবস্থা অনুধাবন করা। আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য নির্ধারিত সময় নির্দেশনা অনুযায়ী বিরত থাকা।

জেনে নিন: সেহরি ও ইফতার কোন জেলায় কখন

রমজানের শেষ দশ দিন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ শেষ দশদিনে মসজিদে এতেকাফ করতেন। প্রয়োজন ব্যতীত তিনি মসজিদ থেকে বের হতেন না।
কেননা এ দশ দিনের মাঝে রয়েছে লাইলাতুল কদর। যা হাজার মাস থেকেও শ্রেষ্ঠ। আল-কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এই দিনে।

‘আমি তো ইহা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রজনীতে। আমি তো সতর্ককারী। এ রজনীতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়।’ সূরা আদ-দুখান : ৩-৪

যে এ রাতে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে ইবাদত-বন্দেগি করবে তার অতীতের পাপগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে। নবী করিম (সা.) এ রাতে ইবাদত-বন্দেগিতে বেশি সময় ও সময় দিতেন, যা অন্য কোন রাতে দেখা যেত না।

মুসলিম শরীফে আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, তিনি এ রাতে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে জাগ্রত থাকতেন এরপর সেহরি গ্রহণ করতেন।