দেশে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আগামী রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আজ বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
সংক্রমণ রোধে ‘ডিজাস্টার-টাইম’ পদক্ষেপ
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী ও মানিকগঞ্জে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এটিকে ‘জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করছে। সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে অধিক সংক্রমণপ্রবণ বা হাই-রিস্ক উপজেলাগুলোতে এই কর্মসূচি জোরালোভাবে শুরু হবে।
সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ দেওয়া হলেও বর্তমান মহামারীতুল্য পরিস্থিতির কারণে এবার ৬ মাস বয়স থেকেই শিশুদের টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘সময়োপযোগী ও সাহসী’ বলে অভিহিত করেছেন।
টিকাদান ও প্রস্তুতির হালচাল
টিকা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবারের মধ্যেই দেশের সব কেন্দ্রে টিকা এবং সিরিঞ্জ পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে মাঠপর্যায়ের সকল স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি আপাতত বাতিল করা হয়েছে।
টিকার উৎস: ইউনিসেফ (UNICEF) ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (Gavi) থেকে ২১.৯ মিলিয়ন ডোজ টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে।
বাজেট: হামসহ ৬টি মারাত্মক রোগের টিকা আমদানির জন্য সরকার ইতোমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।
চিকিৎসা সুবিধা: ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালসহ বড় কেন্দ্রগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ড এবং আইসিইউ ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কেন এই জরুরি কর্মসূচি?
গত কয়েক বছরের উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের পর দেশে বড় ধরনের কোনো ‘ক্লিন-আপ’ বা মাস-ক্যাম্পেইন হয়নি। ফলে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া অনেক শিশু নিয়মিত টিকার বাইরে রয়ে গেছে। একজন হাম আক্রান্ত রোগী থেকে ১৬ থেকে ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে—এই ভয়াবহতার কথা মাথায় রেখেই সরকার এবার ‘পুরো জেনারেশন কাভার’ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
বাবা-মায়ের জন্য জরুরি তথ্য:
নির্ধারিত বয়স: ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সকল শিশু।
তারিখ: আগামী রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে শুরু।
স্থান: নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্র, ইপিআই সেন্টার বা নির্দিষ্ট সরকারি হাসপাতাল।
পরামর্শ: শিশুর জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং টিকার কার্ডটি সংগ্রহে রাখুন।
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও সামান্য অবহেলায় এটি শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিতে পারে। বর্তমান সরকারের এই ত্বরিত উদ্যোগ প্রশংসনীয়, তবে সফলতার মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে সাধারণ মানুষের সচেতনতায়। টিকার ঘাটতি কাটিয়ে যেভাবে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

