সরবরাহ সীমিত করার মাধ্যমে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম বাড়তে শুরু করেছিল, তখনই সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের চুক্তি শিথিল করে ওপেকভুক্ত ও বহির্ভূত দেশগুলো। ফলে বাড়তি উত্তোলনের খবরে বর্তমানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ফের কমতে শুরু করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্যাংক অব আমেরিকা মেরিল লিঞ্চ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বিদ্যমান দরপতন কাটিয়ে আগামী বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও এর জের ধরে দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সীমিত হওয়ার কারণে এ সময় জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ৯০ ডলার ছাড়াতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ থেকে সরিয়ে আনার লক্ষ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগে ছয় জাতি চুক্তি সই হয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ‘মার্কিন স্বার্থ পরিপন্থী’ উল্লেখ করে এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এর পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে রেখেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে ইরান থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ ‘ন্যূনতম পর্যায়ে’ নেমে আসতে পারে বলে মনে করছে মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটি। তখন নতুন করে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির ফ্রন্টিয়ার মার্কেট ইকুইটি রিসার্চ বিভাগের প্রধান হোতান ইয়াজারি বলেন, চলতি বছরের বাকি সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়বে। ফলে জ্বালানি পণ্যটির দরপতনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আগামী বছরের দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে। তখন প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এক নোটে তিনি জানান, জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি একটি অনিশ্চিত সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জ্বালানি পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন। একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, অন্যদিকে সৌদি আরবকে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সৌদি আরবও ‘প্রয়োজন হলে’ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন বাড়াতে কৌশলগতভাবে রাজি হয়েছে। রাশিয়াতেও জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন আগের তুলনায় বাড়ছে। এসবের প্রভাবে চলতি বছরের বাকি সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে নিম্নমুখিতা বজায় থাকতে পারে।
তবে আগামী বছরের শুরু থেকে ইরান ইস্যু জ্বালানি তেলের বাজারে বড় প্রভাবক হিসেবে দেখা দেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানি তেলের বাজার থেকে ইরানকে হটিয়ে দেয়ার কৌশল নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এমনটা সত্যি হলে, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বহুলাংশে কমে আসবে। যদিও সৌদি আরব, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এ সরবরাহ সংকট কাটানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। তথাপি ইরানকে কেন্দ্র করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানির পরিকল্পনা করছে ইরান। রোববার দেশটির ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইশহাক জাহাঙ্গীরি বলেন, ইরানের জ্বালানি তেল রফতানি খাতকে চরম আঘাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আমরা এটা হতে দিতে পারি না। এ কারণে জ্বালানি তেল রফতানি খাতে বেসরকারি উদ্যোগ স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর আওতায় যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছতা বজায় রেখে ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি করতে পারবে।
