আজ রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর লুজনিকির মাঠে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া। বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় শুরু হবে এই খেলা। কিন্তু কে হাসবে শেষ হাসি সেই চিন্তায় এখন বিভোর সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা।
৬৩ ম্যাচের নাটকীয়তা ও রোমাঞ্চের পর এখন বাকি কেবল একটি ম্যাচ। যে ম্যাচটিতে চোখ ছিল ৩২টি দলের। কিন্তু মাসব্যাপী লড়াইয়ের পর দুটি দেশই শেষ পর্যন্ত ফাইনালের টিকিট পেয়েছে। হূদয় ভেঙেছে বাকি ৩০টি দলের। ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দল বাছাই পর্বের বাধাই উতরাতে পারেনি। গ্রুপ পর্বেই থেমে গেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানির মিশন। আর্জেন্টিনা-স্পেনের দৌড় শেষ দ্বিতীয় রাউন্ডে। ব্রাজিল-উরুগুয়ের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ আট থেকেই নিয়েছে বিদায়। সোনালি প্রজন্মের বেলজিয়াম ও আরেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে কাঁদতে হয়েছে সেমিফাইনালে হেরে। সব দ্বৈরথ পেরিয়ে টিকে আছে কেবল ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া।
ক্রোয়েশিয়া নতুন চ্যাম্পিয়ন হতে চায়। ফ্রান্স চায় ৯৮ বিশ্বকাপের পর দ্বিতীয় ট্রফি। এই দুই দল আগেও মুখোমুখি হয়েছিল। ৯৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। সেখানে ফ্রান্স ২-১ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়েছিল। ডেবর সুকরদের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়েছিলেন দিদিয়ের দেশম, জিনেদিন জিদানরা।
৯৮ এর পর ২০১৮। পেরিয়ে গেছে আঠার বছর। বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলে গেছে ফ্রান্স, বদলেছে ক্রোয়েশিয়াও। ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়া নতুন শক্তি নিয়ে বেড়ে উঠেছে।
ফুটবলের তামাম দুনিয়া দেখেছে যোগ্য দুই দলই বিশ্বকাপের মঞ্চে উঠেছে। দুই দলে শক্তিমান ফুটবলাররাই রয়েছেন উপরে নিচে সব জায়গায়।
বিশ্বকাপ ফুটবলের বড় বড় দেশ, বড় তারকাদের বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় করে দিয়েছেন তারা। আজ শ্রেষ্ঠত্ব দেখাবার পালা। ফরাসী সৌরভ ছড়াতে চায় ফ্রান্স। আর যুদ্ধে জেতার অভিজ্ঞতা নতুন নয়, এই বলে হুমকি দিয়েছে ক্রোয়েশিয়ানরা। অর্থাৎ, ক্রোয়েশিয়া রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
বিশ্বকাপের আগে থেকেই ফেভারিটের তালিকায় উপরের দিকে ছিল ফ্রান্সের নাম। দলে একঝাঁক তারকার উপস্থিতির কারণেই এ দলটি আতঙ্ক ছড়াচ্ছিল শুরু থেকে। অবশ্য বিশ্বকাপের মঞ্চে শুরুটা তেমন ভালো হয়নি ফ্রান্সের। প্রথম ম্যাচে কোনো রকমে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে তারা। পরের ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পের একমাত্র গোলে জয় পায় পেরুর বিপক্ষে। শেষ ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করেছিল ডেনমার্কের সঙ্গে। সে সময় ফ্রান্সের খেলার মান নিয়েও অনেক প্রশ্ন ওঠে।
তবে ফ্রান্সকে আসল রূপে দেখা যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। আর্জেন্টিনাকে ৪-৩ গোলে হারানোর পথে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান এমবাপ্পে। উরুগুয়ের চীনের প্রাচীরসম ডিফেন্স ভেঙে শেষ আটে ফ্রান্স জয় পায় ২-০ গোলে। শেষ চারে ফ্রান্সকে আটকাতে পারেনি সোনালি প্রজন্মের বেলজিয়ামও।
তবে ফ্রান্সকে নিশ্চয় ছেড়ে কথা বলবে না ক্রোয়েশিয়াও। ক্রোয়াটদের জন্য এ ম্যাচটি প্রতিশোধেরও। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে এ ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হেরেছিল তারা। পূর্বসূরিদের সেই অসমাপ্ত কাজটিই এখন সম্পন্ন করার সুযোগ লুকা মডরিচ-ইভান রাকিতিচদের সামনে।
অথচ বিশ্বকাপের আগে ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে খেলবে এমন বাজি হয়তো খোদ ক্রোয়াটরাই ধরতে চাইত না। দলে বিশ্বমানের তারকার অভাব না থাকলেও বড় মঞ্চে অনেকদিন ধরেই সাফল্য নেই দলটির। তবে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে শুরুটা বেশ ভালোই করে তারা।
এরপর সামনে পড়ে ফেভারিট আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির দলকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় বলকান অঞ্চলের দলটি। শেষ ম্যাচে আইসল্যান্ডকে হারায় ২-১ গোলে। নকআউট পর্বে অবশ্য কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় ক্রোয়েশিয়াকে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ডেনমার্কের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। যেখানে সুবাসিচ বীরত্বে জয় পায় জ্লাতকো দালিচের দল।
স্বাগতিক রাশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও ক্রোয়েশিয়াকে পড়তে হয় কঠিন পরীক্ষায়। ২-২ গোলে ড্র হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। যেখানে ৪-৩ গোলে জিতে সেমিফাইনালের টিকিট পায় ক্রোয়েশিয়া। আগের দুই ম্যাচের মতো সেমিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও শুরুতে পিছিয়ে পড়ে তারা। এরপর অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে জিতে ইতিহাস গড়ে ফাইনালে ওঠে তারা।
এখন সামনে কেবল ফরাসি বাধা। যেটি টপকাতে পারলে বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শিরোপা হাতে তুলতে পারবে তারা। তবে ক্রোয়েশিয়ার জন্য দুঃসংবাদ হচ্ছে, ফ্রান্সের সঙ্গে পাঁচবারের দেখায় একটি ম্যাচও জিততে পারেনি তারা। প্রথম তিন ম্যাচের তিনটিতে হারলেও পরের দুটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালে এসব পরিসংখ্যান ভুলেই মাঠে নামবে ক্রোয়াটরা। যেখানে জয় ছাড়া আর কিছুই ভাবছেন না মডরিচ-রাকিতিচরা।

