পরিবেশ সুরক্ষায় ৮ বছরে ৪০ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ


পরিবেশ সুরক্ষায় ৮ বছরে ৪০ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ

সংবিধান থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন সলের নির্বাচনী ইশতেহারে বারংবার পরিবেশের সুরক্ষার কথা উঠে আসলেও গত আট বছরে বৈশ্বিকভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় ৪০ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ ।

গত বছর বিশ্বের ১৮০টি দেশের সরকারের পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি (ইপিআই)। তাতে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০ ধাপ পিছিয়ে ১৭৯তম অবস্থানে পৌঁছেছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের পরে মাত্র একটি দেশ অবস্থান করছে।

এছাড়াও গত সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ২৮ শতাংশই মারা গেছে পরিবেশদূষণজনিত নানা অসুখ-বিসুখে, যা এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।

মূলত বনভূমি কমে আসা, বায়ু ও পানিদূষণ এবং পলিথিন-প্লাস্টিকবর্জ্যের বিপদে থাকা শীর্ষ ১০ দেশের তালিকা থেকে এখনো বের হতে পারেনি বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষায় বড় বাধা হিসেবে রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালীদের আইন না মানা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলোর অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী। এসব বাধা পেরিয়ে এই সরকারের জন্য পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে।

গত দুই বছরে বায়ুদূষণে ঢাকা শহর বিশ্বে শীর্ষ পাঁচ শহরের তালিকায় ছিল। কখনো কখনো শীর্ষস্থানেও উঠে এসেছে বাংলাদেশের এই রাজধানীর নাম।

রাজধানীসহ দেশের সামগ্রিক বায়ুদূষণের ৫৬ শতাংশের উৎস ইটভাটা। ইটভাটাগুলোকে পরিবেশবান্ধব করতে সরকার ২০১৮ সালে ইট প্রস্তুত ও ভাটা নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করেছে। নতুন ওই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সব কটি ইটভাটাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার কথা।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ইটভাটাগুলো কৃষিজমিতে স্থাপন করা যাবে না। কৃষিজমি থেকে মাটি তুলে ইট বানানো যাবে না। এ ছাড়া জনবসতি, বাজার ও অর্থনৈতিক তৎপরতা আছে এমন এলাকায় ইট ভাটা রাখা যাবে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, ৯৮ শতাংশ ইটভাটা নতুন আইন অনুযায়ী অবৈধ। সম্প্রতি অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু স্থানীয় উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয় স্থানীয় পর্যায় থেকে এলআর ফান্ড নামে একটি বিশেষ তহবিল সংগ্রহ করে থাকে। তাদের অনানুষ্ঠানিক খরচ মেটাতে সংগ্রহ করা ওই তহবিলের বড় অংশ আসে ইটভাটার মালিকদের কাছ থেকে। আর তাই অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধেও স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় দেখা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, বিশেষত বাসগুলো সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দূষণকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু পরিবহন খাতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাব থাকায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে এই দুটি সংস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বায়ুদূষণের পাশাপাশি নদীর পানির দূষণ মাপে পরিবেশ অধিদপ্তর। সেখানেও ভীতিকর চিত্র। রাজধানীর চারপাশের চারটি নদীর পানি পান ও প্রাণীর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে বহু বছর আগে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মেঘনা, ধলেশ্বরী ও কর্ণফুলী। এসব নদীর তীরে গড়ে ওঠা দূষণকারী শিল্পকারখানার বেশির ভাগের মালিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদেরা। এমনকি বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান সাংসদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নদীদূষণের অভিযোগ ওঠে। পরিবেশ অধিদপ্তর সেগুলোকে জরিমানাও করেছে। সম্প্রতি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সাংসদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নদী দখল ও দূষণের অভিযোগ তুলেছে। উচ্চ আদালত থেকে এ মাসে দেশের নদী রক্ষায় একটি যুগান্তকারী রায় দেওয়া হয়েছে। রায় অনুযায়ী, নদী দখলকারীরা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য ঘোষিত হবেন।

দেশের বনভূমির চিত্র নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফও) ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই)। গত বছরের ২৭ জুন তাদের এক প্রতিবেদন বলছে, গত সাত বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় গত বছরের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের বনভূমি অন্য খাতে চলে যাওয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। তাতে বলা হয়, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৮ হাজার একর বনভূমি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শুধু গত বছরে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও বেসরকারি খাত ১৬ হাজার একর বনভূমি নতুন করে বরাদ্দ চেয়েছে।

সমাজকর্মীরা বলছেন, অভিযোগ জানালে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হয়, ‘বাঘের জন্য-সুন্দরবনের জন্য মায়া বেশি, আর মানুষের জন্য মায়া নেই’, ‘আগে উন্নয়ন, তারপর পরিবেশ রক্ষা’। এসব কথা শুনে বোঝা যায় সরকার পরিবেশ ও বন রক্ষার অঙ্গীকার থেকে ক্রমাগত সরে আসছে। আর পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগ ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে পঙ্গু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে এই দুটি সংস্থার পুনর্গঠন ছাড়া পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না।

দেশের মাটি ও পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ বর্তমানে এমন কোনো বাজার পাওয়া যাবে না, যেখানে পলিথিন ব্যবহৃত হচ্ছে না। রাজধানীর লালবাগ, চকবাজার, টঙ্গী, গাজীপুর বা চট্টগ্রামে এখনো অবৈধ পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের কারখানা ও পাইকারি দোকান পাওয়া যাবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে এমন কারখানার সংখ্যা প্রায় ১৫০।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্লাস্টিক–দূষণকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম। বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডিও) ২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মাটি ও পানিতে ৬৫ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছে। দেশে বছরে যেখানে জৈববর্জ্য বৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে প্লাস্টিক–বর্জ্যের বৃদ্ধির হার সাড়ে ৭ শতাংশ।