আজ পবিত্র শবে বরাত। সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য অত্যন্ত মহিমান্বিত রাত শবে বরাত। এই রাতে আল্লাহ মানবজাতির জন্য তাঁর অসীম রহমতের দরজা খুলে দেন। ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করার সুযোগ ঘটে এই পবিত্র রাতে। বছর ঘুরে এই পবিত্র রাত আসে সৌভাগ্যের বার্তা নিয়ে।
শবে বরাত শব্দটি ফারসি। শব মানে রাত, আর বরাত মানে মুক্তি। সেই হিসেবে শবে বরাত হচ্ছে মুক্তির রজনী। আরবি শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত এই রাত আরবিতে ‘লাইলাতুল বারাআত’ হিসেবে পরিচিত। ইসলাম ধর্মে এই রাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি রজনীর একটি হিসেবে বিবেচিত।
পবিত্র এই রাতে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করলে, আল্লাহর কাছে নিজের পাপ-গুনাহ ও অন্যায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তা কবুল করেন এবং অনুতপ্ত বান্দাকে গুনাহ থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে মাফ করে দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হা মীম! শপথ! স্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয় আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি ছিলাম সতর্ককারী। যাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। এই নির্দেশ আমার তরফ থেকে, নিশ্চয় আমিই দূত পাঠিয়ে থাকি। এ হলো আপনার প্রভুর দয়া, নিশ্চয় তিনি সব শোনেন এবং সব জানেন। তিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং এই উভয়ের মাঝে যা আছে, সেসবের রব। যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস করো, তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, তিনিই তোমাদের পরওয়ারদিগার আর তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও। তবু তারা সংশয়ে খেলা করে। তবে অপেক্ষা করো সেদিনের, যেদিন আকাশ সুস্পষ্টভাবে ধূম্রাচ্ছন্ন হবে।’ (সুরা দুখান, আয়াত: ১-১০)।
মুফাসসিরিনরা বলেন: এখানে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলে শাবান মাসের পূর্ণিমা রাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাযহারি, রূহুল মাআনি ও রূহুল বায়ান)। হজরত ইকরিমা (রা.) সহ কয়েকজন তফসিরবিদ সাহাবি থেকে বর্ণিত আছে, সুরা দুখানের দ্বিতীয় আয়াতে বরকতের রাত্রি বলে শবে বরাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন)।
হাদিস শরিফে আছে, হজরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)।
হজরত আবু সালাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসে, তখন আল্লাহ তাআলা মাখলুকাতের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান; মুমিনদের ক্ষমা করে দেন, কাফিরদের ফিরে আসার সুযোগ দেন এবং হিংসুকদের হিংসা পরিত্যাগ ছাড়া ক্ষমা করেন না। (কিতাবুস সুন্নাহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮২)।
হজরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে আমার ধারণা হলো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; আমি তখন উঠে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল; তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ করে বললেন: হে আয়িশা! তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে? আমি উত্তরে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না।
নবীজি (সা.) বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন। তখন নবীজি (সা.) বললেন: এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত; এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন; ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। (শুআবুল ঈমান, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮২)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: যখন শাবানের মধ্য দিবস আসবে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত করবে এবং দিনে নফল রোজা পালন করবে। (ইবনে মাজাহ)। ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নামাজ; সুতরাং নফল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নফল নামাজ। প্রতিটি নফল ইবাদতের জন্য তাজা অজু বা নতুন অজু করা মুস্তাহাব। বিশেষ ইবাদতের জন্য গোসল করাও মুস্তাহাব। ইবাদতের জন্য দিন অপেক্ষা রাত শ্রেয়তর।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: যখন শাবানের মধ্যরাত আসে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত করো এবং দিনে রোজা পালন করো। (সুনানে ইবনে মাজাহ)। এ ছাড়া প্রতি মাসের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখ আইয়ামে বীজ-এর নফল রোজা তো রয়েছেই। যা আদি পিতা হজরত আদম (আ.) পালন করেছিলেন এবং আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ও পালন করতেন; যা মূলত সুন্নত। সুতরাং তিনটি রোজা রাখলেও শবে বরাতের রোজার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এ ছাড়া মাসের প্রথম তারিখ, মধ্য তারিখ ও শেষ তারিখ নফল রোজা গুরুত্বপূর্ণ; শবে বরাতের রোজা এর আওতায়ও পড়ে। সওমে দাউদি বা হজরত দাউদ (আ.)-এর পদ্ধতিতে এক দিন পর এক দিন রোজা পালন করলেও সর্বোপরি প্রতিটি বিজোড় তারিখে রোজা হয়। সর্বোপরি রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের পর রজব ও শাবান মাসে বেশি নফল নামাজ ও নফল রোজা পালন করতেন।
আল্লাহ তাআলা যেহেতু এই রাতে তাঁর বান্দাদের জন্য রহমতের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দেন, তাই মুসলমানদের কাছে এটি উৎসবের রাতও বটে। ধর্মীয় দিকের পাশাপাশি ঐতিহ্যগতভাবে এই উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয় মুসলিম সম্প্রদায়। তারা সাধ্যমতো ভালো খাবার তৈরি করে এবং প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যে তা বিতরণের মাধ্যমে এর আনন্দটুকু ভাগ করে নেয়। তবে ভালো খাবারদাবারের এই আয়োজন লোক দেখানো বিষয়ে পরিণত হলে তা হবে এই পবিত্র রাতের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এসব করার চেয়ে বরং এই রাতে উচিত গরিব-দুঃখীদের দান–খয়রাত করা এবং যারা সব সময় ভালো কিছু খেতে পারে না, তাদের জন্য সেই ব্যবস্থা করা।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পবিত্র এই রাতে পটকা ও আতশবাজি পোড়ানোর রেওয়াজ এখন নেই বললেই চলে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে এখনো কেউ কেউ তা করার চেষ্টা করে। এই রাতে পটকা বা আতশবাজি পোড়ানো একদিকে যেমন রাতটির পবিত্রতা ও ভাবগাম্ভীর্য ক্ষুণ্ন করে, তেমনি যাঁরা রাতব্যাপী প্রার্থনায় মগ্ন থাকেন, তাঁদের ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যাঘাত ঘটায়।

