ফিদেল কাস্ত্রো: গেরিলা থেকে কিউবার সর্বাধিনায়ক



তাকে বলা হয় বিপ্লবের মহানায়ক। কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট নেতা, তিনি ফিদেল কাস্ত্রো। পুঁজিবাদী বিশ্বের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের পাশে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ‘দেশটির পাতা মৃত্যুফাঁদ’সহ বহু প্রতিবন্ধকতা জয় করে অর্ধশতক কাল নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ফিদেল কাস্ত্রো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলির একটি। এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি সারাজীবন জোয়ারের বিরুদ্ধে সাঁতরে পারে উঠেছেন। আর তা করেছেন বারবার। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পুরোধা এই মানুষটি প্রায় ৫০ বছর ধরে ধনতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় বসে সমাজতান্ত্রিক পন্থা মেনে কিউবা শাসন করেছেন। প্রথমে ১৯৫৯ সাল থেক ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত কাস্ত্রো কিউবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে ১৯৭৬ সাল থেকেই ২০০৮ সাল পর্যন্ত একটানা কিউবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলেছেন। এরপর সরে দাঁড়িয়ে ভাই রাউল কাস্ত্রোকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। একনজরে দেখে নিন সমাজতন্ত্রের এই প্রাণপুরুষের জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি।
১৯২৬ সালের আজকের দিনে ১৩ অগাস্ট কিউবার পূর্বাঞ্চলে বিরান জেলায় স্পেনীয় বংশোদ্ভূত এক উদ্বাস্তু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কাস্ত্রো। তাঁর পিতা আখের চাষ করতেন। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়ার সময় ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।
এরপরে গেরিলা বাহিনীর উপরকে জেনারেল বাতিস্তার আক্রমণ ও নিপীড়ন আরও বাড়তে থাকে। সেনা পাঠিয়ে গেরিলা দমনের চেষ্টা করলেও সরকার বিফল হয়। বেশি কিছু সেনা গেরিলা দলে যোগ দেয়। আর অনেক সেনার মৃত্যু হয়। এরপরে সারা কিউবা অশান্ত হয়ে উঠলে আমেরিকার নির্দেশে নির্বাচনের ডাক দেন বাতিস্তা। তবে সিংহভাগ জনগণ সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যাত করে।
যেদিন কাস্ত্রো মেক্সিকো থেকে কিউবায় এসে পদার্পণ করেন সেই দিনটি ছিল জুলাই মাসের ২৬ তারিখ। সেই অনুযায়ী তাঁর আন্দোলনের নাম হয় জুলাই টোয়েন্টি সিক্স মুভমেন্ট। ১৯৫৮ সালে কিউবার মধ্যবিত্তশ্রেণিও কাস্ত্রোর আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে সরকারের বিরোধিতা করে।১৯৫২ সালে দলীয় কংগ্রেসের সদস্য প্রার্থী হন ফিদেল। নির্বাচনে পিপলস পার্টির বিজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও জাতীয় নির্বাচনের আগে জেনারেল বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা দখল করলে নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়১৯৪৭ সালে নবগঠিত কিউবান পিপলস পার্টিতে যোগ দেন ফিদেল। মার্কিন ব্যবসায়ী শ্রেণি ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবিচার, নিম্ন মজুরি দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে লড়াইয়ে নামেন ফিদেল। সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করেন তিনি।
পঞ্চাশের দশকে মার্কিন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে কিউবায় সমাজতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কাস্ত্রোর অবদান অপরিসীম বলে মনে করা হয়। অনেকে সেজন্য তাঁকে সমাজতন্ত্রের প্রবাদপুরুষ বলেও আখ্যায়িত করেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে বিপ্লবই একমাত্র পথ, এই ভাবনা থেকেই ১৯৫৩ সালে মনকাডা সেনা ব্যারাকে হামলা চালান ফিদেল ও তাঁর সহযোগীরা। সেই ঘটনায় ফিদেল পরাস্ত হন এবং তাঁর বহু সহযোদ্ধাকে হত্যার নির্দেশ দেন বাতিস্তা। তবে কোনওভাবে প্রাণে বেঁচে যান ফিদেল। এরপরও তাঁকে বিষ খাইয়ে মারা চেষ্টা হয়। সেই খবর ফাঁস করে দেওয়ায় ফাঁসি দেওয়া হয় পেলেচিয়ার নামে বাতিস্তা সরকারের এক ক্যাপ্টেনকে। পরে জনমতের কথা ভেবে বিচারের ব্যবস্থা করে বাতিস্তা সরকার। আদালতে দাঁড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের কথা জানিয়ে দীর্ঘ ভাষণ দেন তিনি। ফলে ১৫ বছরের সাজা ঘোষণা হলেও প্রবল জনমতের চাপে মাত্র ২ বছরের জেল খেটে ছাড়া পান ফিদেল। তারপরই বিপ্লবী দল গড়তে মেক্সিকোয় পাড়ি দেন তিনি। সেদেশে পৌঁছে একটি গেরিলা বাহিনী তৈরি করেন তিনি। সশস্ত্র দল ও পর্যাপ্ত অস্ত্রভান্ডার মজুত করে চে গেভারা, খুয়ান আলমেদার মতো বিপ্লবীদের সঙ্গে নিয়ে কিউবায় ফেরত আসেন কাস্ত্রো। তারপরই শুরু হয় তাদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড। বাতিস্ত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। তবে এবারও বেশিরভাগ গেরিলা সৈন্য সরকারের আক্রমণের মুখে পড়ে প্রাণ হারায়। তবে এসবের মাঝেই ফিদেলের সমর্থনে একজোট হতে শুরু করে কিউবার যুবসমাজ। ফলে বাতিস্তা সরকারের রাগ গিয়ে পড়ে জনগনের উপরে। যার ফলে আরও বেশি করে সমর্থন বাড়তে থাকে ফিদেল কাস্ত্রোর। একইসঙ্গে ফিদেলের গেরিলা সৈন্য কিউবার রাজধানী হাভানা ঘিরে ধরতে শুরু করলে ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি কিউবা ছেড়ে পালান জেনারেল বাতিস্তা। এরপরে সেনার অন্য জেনারেলরা সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালালে দেশজুড়ে ধর্মঘট করেন কাস্ত্রো। শত শত সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে সামরিক বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে নেয়। এবং এভাবেই সেইবছরের ৯ জানুয়ারি দেশের নিয়ন্ত্রণভাব গ্রহণ করেন ফিদেল কাস্ত্রো।
এরপরই কিউবার প্রথম সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী হন ফিদেন কাস্ত্রো। ১৯৭৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলান তিনি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে ভাই রাউল কাস্ত্রোকে দায়িত্ব দেন। এখন রাউলই কিউবার রাষ্ট্রপ্রধান।
স্বপ্নবাজ এই বিপ্লবী নেতা অজ্ঞাত এক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ২০০৮ সালে ক্ষমতা ছোট ভাই রাউলকে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
পাঁচ দশক ধরে কিউবার নেতৃত্ব দেওয়ার এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাকে অন্তত ৬৩৪ বার হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, যেগুলোর সবগুলোই ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেছেন।
ফিদেল বলেছেন, “হত্যার চেষ্টা এড়িয়ে যাওয়ার যদি কোনো অলিম্পিক ইভেন্ট থাকত, তাহলে নির্ঘাত তাতে আমি স্বর্ণপদক জিততাম।”
মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ও কিউবা থেকে বিতাড়িতদের বিভিন্ন সংগঠন তাকে হত্যার পরিকল্পনাগুলো করেছিল বলেও বহুবার বলেছেন তিনি।
তাকে বিষাক্ত বড়ি, বিষাক্ত সিগারেট ও রাসায়নিকভাবে সংক্রমিত ডাইভিং স্যুট দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়; তার উপর বিষাক্ত পাউডারও প্রয়োগ করা হয়েছিল, যার প্রভাবে তার দাড়ি পড়ে গিয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
তাকে উৎখাতের নানা পরিকল্পনার সঙ্গে কিউবার উপর যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পরও তিনি বহাল তবিয়তেই ছিলেন। অন্যদিকে এসময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নয় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার পালাবদল দেখেছেন তিনি।
আর এভাবেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই করে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন মহান কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রো।  ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর তার প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।