পৃথিবীতে আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে জানান দেই কান্নার মাধ্যমে। এমনকি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কান্নাই থাকে আমাদের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু একটু বয়স বাড়লেই কান্নাকেই আমরা উপহাসের চোখে দেখি। অনেকে তো আবার কান্নার ক্ষেত্রেও লিঙ্গ বৈষম্য তৈরি করে কান্নাকে মেয়েলি নাটকীয়তা হিসেবে অবিহিত করি।
তবে মনোবিদরা মনে করেন মানবজীবনে কান্নাকাটির প্রয়োজনীয়তা আছে। তারা অশ্রুকে একটি পরিচয় ও মানসিক তৃপ্তি হিসেবে দেখেন, যার শারীরিক প্রভাব আছে।
প্রকৃতপক্ষে মানব শরীর তিন ধরনের কান্না উৎপাদন করে। একটা হলো মৌলিক, যা শুষ্কতা থেকে রক্ষার জন্য চোখের বলের উপরে তৈলাক্ত স্তর তৈরি করে। আরেকটি হলো প্রতিবিম্ব, যা চোখে ধূলিকণা বা কিছু পড়লে সেটা থেকে চোখকে রক্ষার জন্য হাজির হয়। পেঁয়াজ কাটার সময় বা তীব্র আলোর মুখোমুখি হলেও এটা হয়ে থাকে। অর্থাৎ চোখ কোনোভাবে বিরক্ত হলে প্রতিবিম্বের মাধ্যমে চোখ দিয়ে পানি বের হয়। তৃতীয়টা হলো আবেগীয়, যা সংবেদনশীল কোনো কারণে ঘটে থাকে। আবেগীয় বা সংবেদনশীল অশ্রুতে মৌলিক ও প্রতিবিম্বের চেয়ে প্রোটিনের মাত্রা বেশি থাকে। প্রোটিনের কারণে অশ্রু অনেক ঘন হওয়ায় ধীরে ধীরে সেগুলো চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে।
এ অশ্রুগুলো যত বেশি গড়িয়ে পড়বে, অন্যদের জন্য তার বার্তাগুলো তত বেশি উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি হবে। সংবেদনশীল অশ্রু একটি সামাজিক ও জৈবিক সংকেত। এটা যোগাযোগেরও একটা মাধ্যম। কিন্তু অনেক সময় মানুষ একা একাই কান্না করে থাকে, যেখানে কান্নার প্রেরক থাকলেও প্রাপক থাকে না। এ বার্তা সামাজিকভাবে নিজের দিকে পরিচালিত হতে পারে অর্থাৎ বার্তাগুলো সে নিজেই নেয় এবং আত্মতৃপ্তি পায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট ফ্রেম রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষের অশ্রুকে ব্যাখ্যা করা যায়। এজন্য তারা অশ্রুর উৎপাদন পরিমাপের জন্য রোগীর চোখ থেকে অশ্রু সংগ্রহ করেন। আবার যখন কোনো মনোবিদ হতাশার রোগীর চিকিৎসা করেন, তখন রোগীর কান্নার বর্ণনা শুনে থাকেন। কান্নার বিভিন্ন ধরনের ওপর অনেক সম্ভাবনা নির্ভর করে। এদের মধ্যেও নানা পার্থক্য দেখা যায়।
এমন রোগীরা বলেন, ‘আমি আগের মতো আর কান্না করি না’, ‘শরীর ও চোখ শুকিয়ে অসাড় হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি প্রতিটি ছোট ছোট বিষয়ের জন্য কেঁদেছি’, ‘আমি কান্নার মতো অনুভব করি কিন্তু কাঁদতে পারি না’। কান্না মানুষের মধ্যে গভীর বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে। আবার বিতর্কিত পৃথককরণও সৃষ্টি করতে পারে। এটা নির্ভর করে মূলত তারা কারা এবং তারা কীভাবে পৃথিবীতে বসবাস করবে, এটা পরস্পর শেয়ার করার মাধ্যমে।
জানেন কি? একই সঙ্গে কান্না করা এবং গান গাওয়া প্রায় অসম্ভব। গলার পেশি একসঙ্গে কান্না ও গানের সংকোচন-প্রসারণ করতে পারে না। এজন্য দ্য ক্রাইং বুক-এর লেখক ও গবেষক হিদার ক্রিস্টল বলেছেন, কান্নার বিপরীত শব্দ হাসি নয় বরং গান। কান্নার সময় গলা ধরে আসে, কোনো কথা পর্যন্ত বলা যায় না।
মানুষ যখন বলতে পারা এবং নিজেকে পরিচালনার শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, তখনই মানুষ কান্না করে। এর অর্থ এই নয় যে শেষ সীমায় পৌঁছার আগ পর্যন্ত তার কথাগুলো ভালো, সত্য বা বিশ্বাসযোগ্য হওয়া উচিত। বরং এটা বোঝায় যে এটা মানুষের ব্রেকিং পয়েন্ট। এরপর সে আর কিছু বলতে পারে না বা নিজেকে পরিচালনা করতে আর সক্ষম হয় না। এটাই তার স্বাভাবিকের সর্বোচ্চ সীমা। এর মানে হলো, যে কারণে অশ্রুগুলো ঝরে পড়ছে, সে বিষয়গুলোর দিয়ে মনোযোগ দেয়ার সময় এসেছে।

