সময়টা ১৯৯৭। দেশে তখন ক্রিকেটের অস্তিত্ব থাকলেও ভালোবাসা পুরোটা ফুটবল জুড়ে। ফুটবল পাগল এ জাতির চায়ের কাপে ঝড় উঠত আবাহনী-মোহামেডান নামে। পুরো দেশ বিভক্ত হয়ে যেতো দুই ভাগে।
সেই ফুটবলের প্রতি এদেশের মানুষের প্রেমকে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা হয়ে উঠেছিল ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি। যেদিন আকরাম খানের হাতে উঠেছিল ক্রিকেট মাঠের প্রথম শিরোপা। জন্ম নিয়েছিল এক নতুন স্বপ্ন, নতুনের ভালোবাসা! যার নাম ক্রিকেট।
বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয়েছিল আগেই। তবু ফাইনাল বলে কথা! জয় ছাড়া কি আর ভাবা যায়? কেনিয়া তখন বাংলাদেশের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে। তাই জিততে হলে সেরাটা দিয়েই জিততে হবে।
আজ থেকে ঠিক ২৩ বছর আগে, আজকেরই তারিখেই সেই স্বপ্নপুরণ করে আকরাম খানের বাংলাদেশ। যেদিন কেবল একটি শিরোপা পেয়েছিল বাংলাদেশ বা একটি বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছিল তেমনটা নয়। সেদিন বাংলাদেশ পেয়েছিল এক ক্রিকেট পাগল জাতি। যেই জাতি একসাথে হাসে, একসাথে কাঁদে। এক সুরে বাংলাদেশ বাংলাদেশ চিৎকারে গলা ফাটায়।
ফাইনালে খালেদ মাসুদ পাইলটের ঐতিহাসিক ছক্কা, শেষ বলে শর্ট ফাইন লেগে বল যেতেই হাসিবুল হোসেন শান্ত আর খালেদ মাসুদ পাইলটের বিজয়ের দৌড় বেশ পুরোনো হলেও রংতুলিতে টাটকা কিছু স্মৃতির ছবি আঁকে।
আর্জেন্টিনাকে ৫ উইকেটে হারনো দিয়ে টুর্নামেন্টে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। তারপর পশ্চিম আফ্রিকাকে ৯ উইকেট, ডেনমার্ককে ৫ উইকেট, আরব আমিরাতকে ১১০ রান ও মালয়েশিয়াকে ৫৯ রানে হারিয়ে ‘বি’গ্রুপের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে চলে যায় লাল সবুজের দল।
হংকংকে ৭ উইকেটে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে শুভসূচনা করে বাংলাদেশ। কিন্তু পরের ম্যাচেই বাধা। আইরিশদের মাত্র ১২৯ রানে অলআউট করেও বৃষ্টির বৈরি আচরণ, আইরিশদের অখেলোয়াড়চিত মনোভাব ও আম্পায়ার-ম্যাচ রেফারির অদূরদর্শিতায় নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয়।
পরাজয় নিশ্চিত জেনে বৃষ্টির পর বাংলাদেশ ইনিংসের ৬.৪ ওভার (বাংলাদেশ বিনা উইকেটে ২৪) পর খেলতে অস্বীকৃতি জানায় আইরিশরা। আম্পায়ার ও ম্যাচ রেফারি তা মেনে নিলে ম্যাচ পন্ড হয়ে যায়। এতে করে জয়ের বদলে মেলে এক পয়েন্ট। তাতেই হিসেবটা কঠিন হয়ে যায় বাংলাদেশের।
নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে জয় অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। হারলেই বাদ- এমন পরিস্থিতির মুখে মাঠে নেমে ফিল্ডিং সেশনটা ভালই কাটে। বাংলাদেশের সুনিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের মুখে ১৭১ রানে অলআউট হয়ে যায় নেদারল্যান্ডস।
কিন্তু মাত্র ১৫ রানে ৪ টপঅর্ডার আতহার আলী (৪), নাইমুর রহমান দুর্জয় (০), সানেয়ার (০) ও আমিনুল বুলবুল (৪) আউট হয়ে গেলে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশ।
এরপরই দৃশ্যপটে আবির্ভাব হয় একজন আকরাম খানের। কঠিন বিপদে, প্রচন্ড চাপে এবং টুর্নামেন্ট থেকে ষষ্ঠবারের মত খালি হাতে ফেরার শঙ্কায় পড়ে অনমনীয় দৃঢ়তা দেখান বাংলাদেশ অধিনায়ক। সন্দেহাতীতভাবেই সংকটে, বিপদে ও চাপের মুখে ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস খেলেন আকরাম।
তার ৬৮ রানের (৯২ বলে) মহামূল্যবান ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ পৌঁছে যায় জয়ের বন্দরে। এরই সাথে সেমিফাইনালও হয়ে যায় নিশ্চিত।
এরপরও বৃষ্টি ছিল টাইগারদের সঙ্গী। বৃষ্টিভেজা সেমিতে স্কটল্যান্ডকে ৭২ রানে হারিয়ে ফাইনালে। আগের রাতের বৃষ্টিতে মাঠ ভিজে ছিল। খেলা শুরু হতে দেরি হয় বেশ।
খেলা গড়ায় রিজার্ভ ডে’তে। খালেদ মাসুদ পাইলট (৭০) আর আমনুল ইসলাম বুলবুলের (৫৭) জোড়া ফিফটি আর মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর (৩১ বলে ৩৯*) কার্যকর ইনিংসে ভর করে ৭ উইকেটে ২৪৩ রানের বড় স্কোর গড়ে ওঠে।
দুই বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিক (৪/২৫) ও এনামুল হক মণির (৩/৩১) সাঁড়াশি বোলিংয়ের মুখে ১৭১ রানে অলআউট হয়ে যায় স্কটিশরা।
পরে ফাইনালেও বৃষ্টি। প্রথমে ব্যাট করা কেনিয়া স্টিভ টিকোলোর অনবদ্য সেঞ্চুুরিতে (১৫২ বলে ১৪৭) দাঁড় করায় ৭ উইকেটে ২৪১ রানের সংগ্রহ। কেনিয়ার ইনিংস ভালোয় ভালোয় শেষ হলেও বাংলাদেশের ইনিংস শুরুর আগেই বৃষ্টি চলে আসে।
তারপর হেলিকপ্টার দিয়ে মাঠ শুকানো হয়। ফাইনাল গড়ায় পর দিন অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। শান্ত-পাইলটের এক রানের দৌড়, ডি এল মেথডে ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে আজ ক্রিকেট প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে বাংলাদেশ।
যেই প্রেমেই আজ একজন মাশরাফি, একজন সাকিব, একজন মুশফিক-তামিম-মাহমুদউল্লাহ্রা গড়ে ওঠে।

