এক. ‘অনেক কষ্টে দিন চলছিল,তার মধ্যে লকডাউন দেওয়া হয়েছে। আরও কষ্টে আছি। আগে একটি বেসরকারি সংস্থায় জব করতাম, এখন প্রজেক্ট নেই। জবলেস হয়ে আছি। মানসম্মান ত্যাগ করে আপনাকে জানাচ্ছি । ….প্রজেক্ট শেষে কিছু টাকা পাই তা দিয়ে দুইটা রিকসা কিনে ভাড়া দিয়েছিলাম কিন্তু লকডাউনে রিকসাগুলো চলছে না। খাবারের কষ্টে আছি। ’
দুই. ‘খুব কষ্টে রোজা করতেছি, যদি ১-২ দিনের মধ্যে কোনও ব্যবস্থা করতেন তাহলে দু’মুঠো ভালভাবে খেয়ে রোজা রাখতে পারতাম। আমার ঠিকানা….।’
কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের একটি ফেসবুক পেজে এমন শত শত ম্যাসেজ দিয়ে খাদ্য সহায়তা চাচ্ছেন খাদ্য সংকটে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা। সাড়াও মিলছে। করোনা সংকট মোকাবেলায় লকডাউন চলাকালীন দুর্যোগময় সময়ে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে তহবিল গঠন করে সাধ্যমত খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এমন অসহায় লোকদের।

সরকারিভাবে জেলায় হাজারো কর্মহীন দুস্থ পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এসব পরিবারের অনেকে খাদ্য সংকটে পড়লেও প্রকাশ্যে খাদ্য সহায়তা চাইতে পারছেন না।
আবার খাদ্য সংকটে পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে পড়েছেন মহাসংকটে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় কাজ করা ব্যক্তি এবং টিউশনি ও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করা হাজারো পরিবার চরম বিপাকে পড়েছেন।
এমন পরিবারগুলোর মধ্যে যারা খাদ্য সংকটে রয়েছেন তাদের জন্য ‘পুলিশ সুপার, কুড়িগ্রাম’ নামক ফেসবুক পেজে ম্যাসেজ দেওয়ার মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা পাওয়ার সুযোগা দেওয়া হয়েছে।
সহায়তা চাওয়া পরিবারগুলো যাতে সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন না হন সেজন্য রাতের আঁধারে তাদের দুয়ারে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে জেলা পুলিশ। প্রতি রাতে প্রায় ৪০-৫০ টি পরিবারকে এভাবে খাদ্য সহায়তা দিয়ে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরেও মানবিক সহায়তার কাজ করে চলছে কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ।
পুলিশ কর্তৃক সাহায্য পেয়ে নিজের সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে পেরে এক সাহায্য গ্রহীতা জানিয়েছেন,‘ আমার বাচ্চারা খুব খুশি হয়েছে, ছোট মেয়ে সব জিনিস দোকানের মত ধরে আছে আর বড় মেয়ে হিসাব করে দেখতেছে কতদিন খাবো!
ওদের খুশি আপনাকে আমার ভাষায় বোঝাতে পারবো না। ধন্যবাদ, সৃষ্টিকর্তা আপনার মঙ্গল করুন!’ এভাবেই খাদ্য সংকটে থাকা শত শত অসহায় মানুষদের বাড়ি বাড়ি ত্রাণ পৌঁছে দিয়ে তাদের খাদ্য সংকট নিরসনে সহায়তা করার পাশাপাশি দুর্ভোগে থাকা মানুষগুলোর মুখে হাসিও ফোটাচ্ছে জেলা পুলিশ।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে যখনই কোনও পরিবারের খাদ্য সংকটের ম্যাসেজ পাচ্ছেন তখনই সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে দিয়ে সেই পরিবারের কাছে সকলের অগোচরে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছেন পুলিশ সুপার মো. মহিবুল ইসলাম খান।
পুলিশ সুপার জানান, ‘পুলিশ সুপার, কুড়িগ্রাম’ নামে ফেসবুক পেজে প্রতিদিন প্রচুর ম্যাসেজ আসছে। সকলকে হয়তো সহায়তা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রতি রাতে ৪০-৫০ টি পরিবার-যারা খাদ্য সংকটের কথা প্রকাশ্যে বলতে পারছেন না, তাদের দ্বারগোড়ায় খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রমজানের আগে সংবাদ কর্মীদের সহায়তায় এক হাজারেরও বেশি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন,‘ এই রমজানে ম্যাসেজ পেয়ে ইতোমধ্যে আড়াইশ’ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তাদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে। এছাড়াও রমজানের এই কয়েকদিনে আরও সাড়ে সাতশ’ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গোপনীয়তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে রাত্রিকালীন সময়ে এসব খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’
জেলার দলিত সম্প্রদায়ের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন,‘ প্রায় পাঁচশত দলিত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। খুব শিঘ্রই তাদেরকে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।’
এসব খাদ্য সহায়তার তহবিল গঠনে জেলা পুলিশের অনেক সদস্য, বন্ধু ও শুভানুদ্ধায়ীদের স্বেচ্ছা অনুদান রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
পেপার’স লাইফ/চন্দন কুমার সরকার/কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

